ঢাকা ০১:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আওয়ামী লীগের সাথে রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ নেই: ডা. জাহেদ উর রহমান এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি রাখছেন বিক্রেতারা প্রবাসীদের সেবায় বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করতে আসছে ‘প্রবাসী কার্ড’ কুমিল্লার দাউদকান্দিতে অজ্ঞাত গাড়ির চাপায় স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু রিয়াদে হুতিদের টানা তৃতীয় দিনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভ ও আটক ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি: ডনাল্ড ট্রাম্প ডারবান টেস্টের শেষ দিনে জয়ের সুবাস পাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া কটিয়াদীতে ১০০ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি কাশেম মিয়া গ্রেপ্তার ইউপি নির্বাচন: বিএনপির সামনে তৃণমূল সামলানোর বড় পরীক্ষা

সিরিয়া-লেবাননে ধাক্কা খেলেও জলপথে বাড়ছে ইরানের প্রভাব

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১০:৪৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাবের ভূগোলকে নতুন করে বদলে দিচ্ছে। সিরিয়া ও লেবাননের মতো ঐতিহ্যগত স্থলভাগে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোয় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে তেহরান। এক অঞ্চলের প্রভাব হারিয়ে অন্য অঞ্চলে নতুন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করছে ইরান ও তার মিত্ররা।

গত সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরে লেবাননের দক্ষিণে আল তাহির পাহাড়ের নিচের একটি শক্তিশালী হিজবুল্লাহ ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েল। গত দুই বছরে ইরানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্রের বড় অংশ এবং অনেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে হারিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাবকে অনেকটাই সংকুচিত করেছে। আসাদ সরকারের পতনের ফলে হিজবুল্লাহর কাছে ইরানের রসদ ও অস্ত্র সরবরাহের মূল পথটি বন্ধ হয়ে গেছে।

কৌশলগত এই দুর্বলতার বিপরীতে ইয়েমেনে ইরানের আরেকটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা এবং মোখা বন্দর ও পেরিম দ্বীপ দখল করে বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে এগিয়ে গেছে। এই প্রণালিটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে অবস্থান শক্ত করায় সমুদ্রের জাহাজ চলাচলের ওপর নজর রাখতে পারছে। যদিও হুতিরা কেবল নির্দিষ্ট কিছু জাহাজে হামলার দাবি করছে, তবে তাদের এই হুমকির কারণে বিশ্বজুড়ে নৌপরিবহন খরচ ও বিমা ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।

২০২৬ সালে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এহিয়া রহিম সাফাবি এক সম্মেলনে বলেছিলেন, সিরিয়া ও লেবাননের মাধ্যমে ইরানের প্রভাব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তখন হিজবুল্লাহর অস্ত্র ও সিরিয়ার রসদ সরবরাহ পথ ছিল ইরানের কৌশলগত সুরক্ষার মূল ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার পর ইরান এখন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। গত ৮ জুন কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি একটি নতুন নিরাপত্তাবলয়ের ঘোষণা দেন, যা হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল-মানদেব এবং পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে, সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে ইরান ও তার মিত্ররা নতুন কৌশল নিয়েছে।

হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তাদের কেবল ইরানের নির্দেশনায় চলা দল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইয়েমেনের ভেতরে নিজেদের শাসন সুসংহত করা এবং সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপ কমানো তাদের প্রধান লক্ষ্য। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ইরান থেকে সামরিক উপদেষ্টা ও ড্রোন প্রযুক্তি পাঠিয়ে হুতিদের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। হুতিরা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের লড়াই তাদের যৌথ স্বার্থ রক্ষা করে।

ইরান ও হুতিদের এই কৌশলের কারণে সৌদি আরব বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। লোহিত সাগরের বন্দরগুলো নিরাপদ না থাকায় সৌদি আরব তাদের জ্বালানি রপ্তানি আবার হরমুজ প্রণালির দিকে ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছে, তবে সেখানেও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা নেই। এমনকি সৌদি আরবের স্থলভাগের পাইপলাইনগুলোও এখন ঝুঁকিমুক্ত নয়। সম্প্রতি ইরাক থেকে চালানো একটি ড্রোন হামলায় সৌদি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের তিনটি পাম্পস্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই হামলা চালাচ্ছে, যা ইরাক সরকার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন হুমকি তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছে। ইরানি নেতৃত্ব মনে করছে, এই দীর্ঘায়িত সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াবে এবং যেকোনো আলোচনায় তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইরানের নিজস্ব অর্থনীতির ক্ষতি কাটাতে সাহায্য করবে না। উপরন্তু, সৌদি আরবও তাদের বাণিজ্যিক নিরাপত্তার জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল হতে চাইবে না, বরং তারা আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

সিরিয়া-লেবাননে ধাক্কা খেলেও জলপথে বাড়ছে ইরানের প্রভাব

আপডেট সময় : ১০:৪৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইরানের ভূরাজনৈতিক প্রভাবের ভূগোলকে নতুন করে বদলে দিচ্ছে। সিরিয়া ও লেবাননের মতো ঐতিহ্যগত স্থলভাগে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোয় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে তেহরান। এক অঞ্চলের প্রভাব হারিয়ে অন্য অঞ্চলে নতুন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করছে ইরান ও তার মিত্ররা।

গত সেপ্টেম্বর মাসের ১০ তারিখে ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরে লেবাননের দক্ষিণে আল তাহির পাহাড়ের নিচের একটি শক্তিশালী হিজবুল্লাহ ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েল। গত দুই বছরে ইরানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিজবুল্লাহ তাদের অস্ত্রের বড় অংশ এবং অনেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে হারিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাবকে অনেকটাই সংকুচিত করেছে। আসাদ সরকারের পতনের ফলে হিজবুল্লাহর কাছে ইরানের রসদ ও অস্ত্র সরবরাহের মূল পথটি বন্ধ হয়ে গেছে।

কৌশলগত এই দুর্বলতার বিপরীতে ইয়েমেনে ইরানের আরেকটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা এবং মোখা বন্দর ও পেরিম দ্বীপ দখল করে বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে এগিয়ে গেছে। এই প্রণালিটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে অবস্থান শক্ত করায় সমুদ্রের জাহাজ চলাচলের ওপর নজর রাখতে পারছে। যদিও হুতিরা কেবল নির্দিষ্ট কিছু জাহাজে হামলার দাবি করছে, তবে তাদের এই হুমকির কারণে বিশ্বজুড়ে নৌপরিবহন খরচ ও বিমা ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।

২০২৬ সালে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এহিয়া রহিম সাফাবি এক সম্মেলনে বলেছিলেন, সিরিয়া ও লেবাননের মাধ্যমে ইরানের প্রভাব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তখন হিজবুল্লাহর অস্ত্র ও সিরিয়ার রসদ সরবরাহ পথ ছিল ইরানের কৌশলগত সুরক্ষার মূল ভিত্তি। সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার পর ইরান এখন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। গত ৮ জুন কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি একটি নতুন নিরাপত্তাবলয়ের ঘোষণা দেন, যা হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল-মানদেব এবং পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে, সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে ইরান ও তার মিত্ররা নতুন কৌশল নিয়েছে।

হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তাদের কেবল ইরানের নির্দেশনায় চলা দল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইয়েমেনের ভেতরে নিজেদের শাসন সুসংহত করা এবং সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপ কমানো তাদের প্রধান লক্ষ্য। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ইরান থেকে সামরিক উপদেষ্টা ও ড্রোন প্রযুক্তি পাঠিয়ে হুতিদের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। হুতিরা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের লড়াই তাদের যৌথ স্বার্থ রক্ষা করে।

ইরান ও হুতিদের এই কৌশলের কারণে সৌদি আরব বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। লোহিত সাগরের বন্দরগুলো নিরাপদ না থাকায় সৌদি আরব তাদের জ্বালানি রপ্তানি আবার হরমুজ প্রণালির দিকে ঘোরাতে বাধ্য হচ্ছে, তবে সেখানেও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা নেই। এমনকি সৌদি আরবের স্থলভাগের পাইপলাইনগুলোও এখন ঝুঁকিমুক্ত নয়। সম্প্রতি ইরাক থেকে চালানো একটি ড্রোন হামলায় সৌদি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের তিনটি পাম্পস্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই হামলা চালাচ্ছে, যা ইরাক সরকার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ ইরানকে আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন হুমকি তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছে। ইরানি নেতৃত্ব মনে করছে, এই দীর্ঘায়িত সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াবে এবং যেকোনো আলোচনায় তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। তবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইরানের নিজস্ব অর্থনীতির ক্ষতি কাটাতে সাহায্য করবে না। উপরন্তু, সৌদি আরবও তাদের বাণিজ্যিক নিরাপত্তার জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল হতে চাইবে না, বরং তারা আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo