জলবায়ু সংকটের মাশুল কেন গুনছে নেপাল?
- আপডেট সময় : ১০:৩৬:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক জলবায়ু নীতি নিয়ে এক দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করা একজন নেপালি নাগরিক হিসেবে, নেপালের উপত্যকাগুলোতে আছড়ে পড়া সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার তাণ্ডব দেখে আমি ক্ষুব্ধ না হয়ে পারি না। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে, পৃথিবী উত্তপ্ত হওয়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও ঘন ঘন, হিংস্র ও অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠবে। বিশ্বনেতাদের জলবায়ু পদক্ষেপ গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার চরম মাশুল হিসেবেই আজকের এই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
এই বন্যা কেবল ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নয়, বরং জলবায়ু সংকটের আসল চেহারা উন্মোচন করেছে। বর্তমান প্রযুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া নতুন মাত্রার বিপর্যয় শনাক্ত করতে একেবারেই অপ্রতুল। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল ভোটেকোশি উপত্যকার সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উদাহরণটি দেখা যাক। নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রমের সংকেত পাওয়ার আগেই পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথর, বরফ ও কাদার স্রোত মূল হাইড্রোলজিক্যাল স্টেশনগুলো চুরমার করে দেয়। এই প্রযুক্তিগুলো ধীরগতির পানি বৃদ্ধির হিসাব মাপার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া পর্বতপ্রমাণ ঢেউয়ের মোকাবিলায় তা একেবারেই অকার্যকর ছিল।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একটি বিশাল হিমবাহ ধসে বরফ ও পাথরের ধস নামে এবং কাদার স্রোত তৈরি হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে সেই বাঁধ ভেঙে প্রচণ্ড তীব্রতায় স্রোত নিচে নেমে আসে। প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানে এখনো বৈজ্ঞানিক তদন্ত চলছে। কর্তৃপক্ষ যখন বন্যার খবর পায় এবং ভাটির এলাকায় সতর্কতা জারি করে, ততক্ষণে উৎসস্থলের কাছের জনপদগুলোর জন্য আর কোনো সময় অবশিষ্ট ছিল না। পর্যবেক্ষণ অবকাঠামো শুধু সতর্কবার্তা পাঠাতে ব্যর্থ হয়নি, বন্যা শনাক্ত করার আগেই তা ধ্বংস হয়ে গেছে। আমাদের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সত্যনিষ্ঠ হওয়া জরুরি। একটি সতর্কতা তখনই কার্যকর, যখন পদক্ষেপ নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে।
ভোটেকোশি নদীর তীরের মানুষ হিমালয় উত্তপ্ত করেনি কিংবা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতিও বেছে নেয়নি। নেপালসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো পরিকাঠামো মজবুত ও দুর্যোগ প্রস্তুতি বাড়িয়ে টিকে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করলেও, ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণকারী ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রায় পাচ্ছেই না। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নেপালের অবদান শূন্য দশমিক ১ শতাংশের কম হলেও, না করা অপরাধের চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশটিকে। এর চেয়ে বড় অন্যায় আর হতে পারে না।
ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কোনো ‘দান’ নয়, বরং সংকটের বলির পাঁঠা হওয়া মানুষদের কাছে এটি উন্নত বিশ্বের ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা। ধনী দেশগুলোর পাপের মাশুল দিতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর সীমিত সম্পদ বারবার মেরামত কাজে নষ্ট হওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত নয়। তাই নেপালের সামনে সম্পদ শোষণের বদলে মানুষ, জীবিকা ও পরিবেশগত সহনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে লাভবান হওয়া ধনী দেশগুলোর দায়ভার এড়ানোর সুযোগ নেই; তাদের দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিতে উত্তরণ ঘটাতে হবে। এটি কোনো দয়া নয়, বরং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের দাবি। বিপুল মুনাফা লুটে নেওয়া জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোকেও এই দায় থেকে আলাদা করা যাবে না।




























