ঢাকা ০৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
কিংবদন্তি হলিউড অভিনেতা টিম কারি আর নেই, ৮০ বছর বয়সে প্রয়াণ ২০১৪-২০২৫: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ওপর সাত ধরনের নিপীড়নের তথ্য প্রকাশ টানা দ্বিতীয় জয়ে লা লিগার শীর্ষে বার্সেলোনা স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রানের সিংহাসন ফিরে পেলেন পোলার্ড নভেম্বরে তুরস্ক সফরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চৌগাছায় সার বাজারে প্রশাসনের মনিটরিং, ১০ হাজার টাকা জরিমানা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ, বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট কক্সবাজারে হোটেল বারে সংঘর্ষে ভাঙা গ্লাসের আঘাতে যুবক নিহত পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার দেশের ৬৪ জেলায় আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন তদারকিতে ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপ

গান-বাজনা ও সভা-সমাবেশে বাধা: সংকুচিত হচ্ছে নাগরিক অধিকার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:২৩:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন এবং অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়। পরীক্ষার কারণে উচ্চ শব্দে গান বাজানো নিয়ে বাদানুবাদ থেকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হলেও, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের সূত্র উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটি এমন যে সেখানে গান-বাজনা ও সিনেমা বহু বছর ধরে এক প্রকার নিষিদ্ধের মতোই এবং সেখানকার পরিস্থিতি ভিন্ন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল একটি তাৎক্ষণিক বাদানুবাদকে ইঙ্গিত করে না, অথচ এটিকে ওই অঞ্চলের একটি স্থানিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। এর মাত্র মাস দুয়েক আগে সেখানে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করেও তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে যেখানে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রধান কাজ, সেখানে এ ধরনের বক্তব্য হামলাকারীদের আরও উৎসাহিত ও উসকে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। প্রায় একই সময়ে কিশোরগঞ্জেও ‘ইমাম-উলামা পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সদর শাখা’র আপত্তিতে একটি কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে এবং বিভিন্ন মহলে ঈদে-মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান বাতিলের দাবিও উঠেছে।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এই বাধার বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের একটি ইতিবাচক উদাহরণ টানা যায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জয়পুরহাটে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে স্থানীয় একটি গোষ্ঠীর ভাঙচুরের কারণে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশে সেখানে গণশুনানির আয়োজন করা হয় এবং হামলাকারীরা আর বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সরকার সক্রিয় হলে দমন-পীড়ন ছাড়াই নাগরিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক আয়োজন সচল রাখা সম্ভব। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করা এবং বাতিলকারীদের বৈধতা দেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

সাংস্কৃতিক পরিসরের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সংকোচনের আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত ২২ আগস্ট অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল ‘অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন’ ও ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) শেষ মুহূর্তে সমাবেশের অনুমতি বাতিল করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ’ সংগঠনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাস্তা বন্ধ না করে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আয়োজিত একটি সমাবেশকে মামলার অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়ার এই যুক্তিকে বিপজ্জনক মনে করা হচ্ছে, কারণ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামেই একাধিক মামলা রয়েছে।

এ ধরনের একের পর এক নিষেধাজ্ঞা ও হামলা নাগরিক অধিকারের মুক্ত স্থানকে গ্রাস করছে। আজকের পত্রিকার ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের যেসব মাজার ও দরবারে হামলা হয়েছিল, তার অধিকাংশই আর খোলেনি। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল শর্তই হলো বহুত্ববাদ ও সহাবস্থান নিশ্চিত করা। যারা সিনেমা বা গান পছন্দ করেন, তারা যেমন তা আয়োজন করতে পারবেন; তেমনই যারা এটি পছন্দ করেন না, তারা ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে তাদের অপছন্দের কথা জানাতে পারেন। কিন্তু মতপ্রকাশের নামে হামলা চালানো বা অনুষ্ঠান বাতিল করা সহাবস্থানের মূল নীতিকেই ধ্বংস করে দেয়। রাষ্ট্র যদি হামলাকারীদের অবস্থানকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিতে থাকে, তবে তা কেবল গণতান্ত্রিক রূপান্তরকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং খোদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

গান-বাজনা ও সভা-সমাবেশে বাধা: সংকুচিত হচ্ছে নাগরিক অধিকার

আপডেট সময় : ১২:২৩:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন এবং অনুষ্ঠানটি পণ্ড হয়ে যায়। পরীক্ষার কারণে উচ্চ শব্দে গান বাজানো নিয়ে বাদানুবাদ থেকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হলেও, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের সূত্র উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটি এমন যে সেখানে গান-বাজনা ও সিনেমা বহু বছর ধরে এক প্রকার নিষিদ্ধের মতোই এবং সেখানকার পরিস্থিতি ভিন্ন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল একটি তাৎক্ষণিক বাদানুবাদকে ইঙ্গিত করে না, অথচ এটিকে ওই অঞ্চলের একটি স্থানিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। এর মাত্র মাস দুয়েক আগে সেখানে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করেও তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে যেখানে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রধান কাজ, সেখানে এ ধরনের বক্তব্য হামলাকারীদের আরও উৎসাহিত ও উসকে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। প্রায় একই সময়ে কিশোরগঞ্জেও ‘ইমাম-উলামা পরিষদ, কিশোরগঞ্জ সদর শাখা’র আপত্তিতে একটি কনসার্ট বাতিল করা হয়েছে এবং বিভিন্ন মহলে ঈদে-মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান বাতিলের দাবিও উঠেছে।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে এই বাধার বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের একটি ইতিবাচক উদাহরণ টানা যায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জয়পুরহাটে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে স্থানীয় একটি গোষ্ঠীর ভাঙচুরের কারণে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নির্দেশে সেখানে গণশুনানির আয়োজন করা হয় এবং হামলাকারীরা আর বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সরকার সক্রিয় হলে দমন-পীড়ন ছাড়াই নাগরিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক আয়োজন সচল রাখা সম্ভব। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করা এবং বাতিলকারীদের বৈধতা দেওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

সাংস্কৃতিক পরিসরের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সংকোচনের আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত ২২ আগস্ট অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল ‘অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন’ ও ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) শেষ মুহূর্তে সমাবেশের অনুমতি বাতিল করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘অহিংস গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশ’ সংগঠনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাস্তা বন্ধ না করে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আয়োজিত একটি সমাবেশকে মামলার অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়ার এই যুক্তিকে বিপজ্জনক মনে করা হচ্ছে, কারণ দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামেই একাধিক মামলা রয়েছে।

এ ধরনের একের পর এক নিষেধাজ্ঞা ও হামলা নাগরিক অধিকারের মুক্ত স্থানকে গ্রাস করছে। আজকের পত্রিকার ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের যেসব মাজার ও দরবারে হামলা হয়েছিল, তার অধিকাংশই আর খোলেনি। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল শর্তই হলো বহুত্ববাদ ও সহাবস্থান নিশ্চিত করা। যারা সিনেমা বা গান পছন্দ করেন, তারা যেমন তা আয়োজন করতে পারবেন; তেমনই যারা এটি পছন্দ করেন না, তারা ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে তাদের অপছন্দের কথা জানাতে পারেন। কিন্তু মতপ্রকাশের নামে হামলা চালানো বা অনুষ্ঠান বাতিল করা সহাবস্থানের মূল নীতিকেই ধ্বংস করে দেয়। রাষ্ট্র যদি হামলাকারীদের অবস্থানকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিতে থাকে, তবে তা কেবল গণতান্ত্রিক রূপান্তরকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং খোদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo