২০১৪-২০২৫: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ওপর সাত ধরনের নিপীড়নের তথ্য প্রকাশ
- আপডেট সময় : ০৪:৩৮:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকেরা সাত ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে এক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফার এক যৌথ গবেষণাপ্রবন্ধে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে ‘বাংলাদেশে একাডেমিক স্বাধীনতা: অবস্থা, প্রকৃতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এই গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়।
আইআইই-দ্য পাওয়ার অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন এবং সোশ্যাল সায়েন্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (এসএসএ) যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে। গবেষণায় শিক্ষকদের ওপর হওয়া যে সাত ধরনের নিপীড়ন চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো হলো—হত্যা, গুম, শারীরিক নির্যাতন ও হেনস্তা, গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুতি, বাধ্যতামূলক ছুটি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং সমালোচনামূলক জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র সংকোচন।
গবেষণার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, এই দীর্ঘ সময়ে নিপীড়নের মুখে শিক্ষকদের মধ্যে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রথমত, অনেকে স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপের পথ বেছে নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, একটি ছোট বা ভিন্ন অংশ ক্রমাগত বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। ‘দমনমূলক শাসন ও একাডেমিক স্বাধীনতা: কর্তৃত্ববাদী বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কণ্ঠরোধ ও সংগঠিতকরণ (২০১৪-২০২৫)’ শীর্ষক এই গবেষণায় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় শিক্ষকদের ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়। এই নেটওয়ার্ক সদস্যদের আবেগপূর্ণ, আইনি ও আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে টিকে থাকার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।
গোলটেবিল বৈঠকে মোট পাঁচটি গবেষণাপ্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আনিসুর রহমান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ-আল মামুনের যৌথ গবেষণাপ্রবন্ধ ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা: আইন, রাজনীতি ও বাংলাদেশে একাডেমিক স্বাধীনতা’-এর ফলাফল তুলে ধরে বলা হয়, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইন কেবল প্রশাসন পরিচালনার জন্য নয়, বরং আনুগত্য নিশ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আনিসুর রহমান জানান, দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক স্বাধীনতার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও নেই এবং নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সরাসরি বাড়ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজলী শেহরীন ইসলামের যৌথ প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় অভিযোগের প্রতিকার ও একাডেমিক স্বাধীনতা’-তে বলা হয়, রাষ্ট্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি আদর্শিক কাঠামো বা অ্যাপারেটাস হিসেবে ব্যবহার করছে। তাঁরা ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীদের মানসিক যন্ত্রণাকে কেন্দ্র করে একটি ক্ষতিপূরণ ও পুনর্মিলনভিত্তিক বিচারব্যবস্থা (রেস্টোরেティブ জাস্টিস সিস্টেম) চালুর দাবি জানান।
অন্যদিকে, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ ও যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের ফ্যাকাল্টি মেম্বার ফাহমিদুল হকের ‘গুণগত মানের মূল্য: বাংলাদেশে একাডেমিক স্বাধীনতা ও উচ্চশিক্ষার নব্যউদারীকরণ প্রক্রিয়া’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়, নব্বইয়ের দশক থেকে উচ্চশিক্ষার নব্য উদারীকরণ শুরু হলেও দেশের উচ্চশিক্ষা এখনো সম্পূর্ণ পাঠদাননির্ভর। শক্তিশালী গবেষণা ডিগ্রি বা পর্যাপ্ত তহবিল না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদের ওপর গবেষণার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে, যা একাডেমিক স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করছে। এছাড়া, দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ দেশের ওপর করা এক তুলনামূলক বিশ্লেষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম দেখান যে, ছাত্ররাজনীতি জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারলেও তা বিভিন্ন পর্যায়ে একাডেমিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে।
উপস্থাপিত প্রবন্ধগুলোর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশে স্বৈরশাসন ও নব্য উদারতাবাদের এক ভয়াবহ সংমিশ্রণ ঘটেছে, যা শিক্ষা খাতকে বিপর্যস্ত করেছে। দেশে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে একাডেমিক স্বাধীনতা পাওয়া অসম্ভব। বর্তমান উপাচার্য নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় যে ধরনের উপাচার্য নিয়োগ হতো, এখনো ঠিক সেইভাবেই হচ্ছে। এমন সব উপাচার্য নিয়োগ হচ্ছে, যা অবিশ্বাস্য মাত্রার নিম্নমানের। বোঝাই যাচ্ছে, তাঁদের নিয়োগ করা হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে এমন গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন ও জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য শামস রহমান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক শেখ নাহিদ নিয়াজী, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শর্মী হোসেন, জাতীয় ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি তাহমীদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী এবং ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মিশকাতুল মাশিয়াত।
সেখানে নিজেদের গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে সামিনা লুৎফা বলেন, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষকদের ওপর যেসব নিপীড়ন হয়েছে, তার দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—১.
অনেকে সেলফ-সেন্সরশিপে (স্বনিয়ন্ত্রণ) চলে গেছেন, কথা বলা বন্ধ করেছেন; ২.

























