দেশে ৮ মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার, বাড়ছে নৃশংসতা
- আপডেট সময় : ০৮:৫৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর অন্তত ৩৬টি শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্যে এই আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে। নিখোঁজ শিশুদের কাউকে নদী থেকে আবার কাউকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হচ্ছে। এর বাইরে শিশুদের ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন এবং পারিবারিক বিরোধের জেরে হত্যার ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তিরাই এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে। এই হত্যাকাণ্ডের পর সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে এক কিশোরের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
অনুরূপভাবে গত ১০ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু বিদ্যালয়ে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। দুই দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝে খুঁড়ে তার মাটিচাপা দেওয়া লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন এবং এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া পাবনা সদরে গত ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়া ১০ বছরের এক শিশুর লাশ সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর একটি ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয়। তাকেও ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ, এবং এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনসহ নানা সহিংসতায় মোট ১৫৫টি শিশু নিহত হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী নিহতদের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
শারীরিক নির্যাতনে নিহত: ৬৮ জনপারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে নিহত: ৪৯ জনধর্ষণের পর হত্যা (দুই ছেলেশিশুসহ): ২৬ জনধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা: ৪ জনগুলিবর্ষণে নিহত: ৩ জনগৃহকর্মীকে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু: ২ জনউত্ত্যক্তকারীর হাতে খুন: ২ জনঅপহরণের পর হত্যা: ১ জনএই পরিসংখ্যানের বাইরে আরও ৯৯টি শিশু আত্মহত্যা করেছে কিংবা তাদের রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম আট মাসে দেশে মোট ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার অর্থ প্রতি মাসে গড়ে ২৯৫টি খুনের ঘটনা ঘটছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে শিশুদেরও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত তিন বোনের মধ্যে সিপার বয়স ছিল ১০ বছর, ইকরার ১৭ বছর এবং সাইমা আক্তারের বয়স ছিল ২১ বছর। আগস্ট মাসে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে খুন করা হয় তাঁদের ১২ বছরের ছেলে আয়ুশকে। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর লাশ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তাঁর এক বছর বয়সী শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে মা ও শিশু উভয়কেই হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া গত ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যা করা হয়।
শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টিও সমাজে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজ হয়েছে। তবে এর মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি অর্থাৎ ১৩,৬৭৯টি শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ২,০৩৮টি শিশু (১৩ শতাংশ) এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
বাংলাদেশে শিশুদের ওপর এই ধারাবাহিক সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। গত ২২ মে এক বিবৃতিতে সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স অপরাধীদের জবাবদিহি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান। তিনি ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সব জায়গায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। ইউনিসেফ শিশু সুরক্ষা বাড়াতে অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশিং ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি স্কুল, মাদ্রাসা ও কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল শিশুদের প্রতি এই নৃশংসতাকে সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকা—কোনো জায়গাতেই যখন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন শিশুদের জন্য আসলে নিরাপদ জায়গা কোথায়? তিনি মনে করেন, শিশুদের ওপর এই সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতা, প্রতিশোধস্পৃহা বা পারিবারিক বিরোধ কাজ করে থাকে। অনেক সময় বড়দের দ্বন্দ্বের বলি হতে হয় শিশুদের। এসব অপরাধের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা গেলে সমাজে সচেতনতা বাড়বে এবং অপরাধের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।




























