উত্তরাঞ্চলে অনলাইন জুয়ার রমরমা বাণিজ্য, মূল ঘাঁটি বগুড়া
- আপডেট সময় : ১০:১৮:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

বগুড়াসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে অ্যাপভিত্তিক অনলাইন জুয়ার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বগুড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব জুয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। একসময় গোপন আড্ডায় জুয়া সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, যা যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং সামাজিক অপরাধের হার বাড়িয়ে তুলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়ার শিবগঞ্জ, শেরপুর, গাবতলী ও ধুনট উপজেলায় অনলাইন জুয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। শিক্ষার্থী, রিকশাচালক ও ব্যবসায়ীরা এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। জুয়ায় ঋণগ্রস্ত হয়ে জমি বিক্রি, চুরি, খুন এবং আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে। চলতি বছর বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় জুয়ার মুদ্রা কেনাবেচার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে ব্যবসায়ী পিন্টু আকন্দ (৩৮) বন্ধুদের হাতে খুন হয়েছেন।
চলতি বছরের মে মাসে র্যাব-১২ বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা (কালীতলা) এলাকায় অভিযান চালিয়ে খাদিজা নামের এক নারী এজেন্টকে আটক করে। তার কাছ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ‘এনজয়২৪৭’, ‘ভেলকি লাইভ’ ও ‘প্লে২৫’ প্ল্যাটফর্মে জুয়া পরিচালনার কথা স্বীকার করেন। র্যাবের তথ্যানুযায়ী, তার ‘এনজয়২৪৭’ অ্যাকাউন্টে ১,৭০৩.৬৪ পিবিইউ ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যালান্স ও ২২ হাজার ৬৯৫টি লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া ‘ভেলকি লাইভ’ অ্যাকাউন্টে ৭০.৭২ পিবিইউ এবং ‘প্লে২৫’ অ্যাকাউন্টে ৬৪৪.৫৭ ডলারের ব্যালান্সসহ ২৪ ঘণ্টায় মাস্টার এজেন্টের সঙ্গে বড় অঙ্কের লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। জুনে গাবতলী মডেল থানা পুলিশ অনলাইন জুয়ার ‘মাস্টার এজেন্ট’ সুষেন চন্দ্র রায়কে (৩০) গ্রেপ্তার করে এবং তার মোবাইলে ওয়ানএক্সবেটের আলামত উদ্ধার করে। তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি ইকবাল বাহারের তথ্যমতে, মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দুই কোটি টাকা ডিজিটাল জুয়ায় লেনদেন হচ্ছে। অসংখ্য অ্যাকাউন্ট ও নম্বরের মধ্যে টাকা হাতবদল হওয়ায় পুরো চক্রটি চিহ্নিত করা জটিল হয়ে পড়েছে। জুয়ায় আসক্তরা বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে সরাসরি টাকা ক্যাশইন করে এক ক্লিকেই ২০ টাকা থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরছে। বর্তমানে ‘ওয়ানএক্সবেট’, ‘মেলবেট’ ও ‘মোস্টবেট’-সহ শত শত অবৈধ অ্যাপ সক্রিয় রয়েছে। বগুড়ার কনটেন্ট ক্রিয়েটর মুশফিকুর রহমান মুন্না জানান, তাকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে জুয়া প্রমোট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করে অন্যদের সতর্ক করেছেন।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বগুড়াকেন্দ্রিক চক্রগুলো প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৮০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার করছে, যা মাসে প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বগুড়া শাখার তথ্য কর্মকর্তা বিশ্বদেব রায় জানান, স্থানীয় শাখায় এ সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে না, কারণ এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আলাদা বিভাগ তদারকি করে।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আতোয়ার রহমান ও ডিবি পুলিশের এক উপপরিদর্শক জানান, ভার্চুয়াল লেনদেনের মাধ্যমে টাকার উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা কঠিন। জেলা পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ জানান, জেলা পুলিশের সাইবার টিম থাকলেও কারিগরি সহায়তার জন্য এখনো ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হয়। বগুড়ায় সরাসরি কারিগরি সাপোর্ট পাওয়া গেলে এসব চক্র নির্মূল করা সহজ হতো। সরকার সম্প্রতি ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে, যা ১৮৬৭ সালের ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ হালনাগাদ করে জনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

























