রাজশাহী থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: রফিকুল আলমের সঙ্গীতযাত্রার গল্প
- আপডেট সময় : ০৮:৫৪:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

দেশের বরেণ্য সংগীতশিল্পী রফিকুল আলমের শৈশব, শিক্ষাজীবন এবং সংগীতের আঙিনায় পা রাখার গল্প উঠে এসেছে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হকের মুখোমুখি হয়ে তিনি তাঁর জীবনের নানা অজানা অধ্যায় ও অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়েছেন। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজশাহীর সীমান্তঘেঁষা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের লক্ষ্মণপুর গ্রামে নানার বাড়িতে জন্ম নেন রফিকুল আলম। ব্রিটিশ আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছিল পশ্চিমবঙ্গের মালদহের একটি সাব-ডিভিশন, যেখানে তাঁর দাদাদের আদি নিবাস ছিল। তাঁর বাবা মাহমুদ গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন ভূস্বামী।
রফিকুল আলমের শৈশব কেটেছে রাজশাহী শহরের সাগরপাড়ায়। তাঁর প্রথম বিদ্যাপীঠ ছিল তৎকালীন বিখ্যাত স্কুল ‘ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমি’। ব্রিটিশ আমল থেকে টোলের মতো পরিচালিত এই স্কুলে সাধারণত সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থীরাই পড়ত এবং মুসলিম ছাত্রদের নেওয়া হতো না। তবে রফিকুল আলমের পরিবারের সাংস্কৃতিক সুনাম ও বড় ভাই ডক্টর সারওয়ার জাহানের জনপ্রিয়তার কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রথমে তাঁর ভাইকে এবং পরে তাঁকেও একমাত্র মুসলিম ছাত্র হিসেবে ভর্তি করে নেয়। ঢাকা বোর্ডের অধীনে থাকা এই স্কুলটি মেধার দিক থেকে অত্যন্ত সুনামধন্য ছিল। পরে তিনি রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ’৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশোনা করেন। প্রথমে অর্থনীতিতে ভর্তি হলেও শিক্ষকদের পরামর্শে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চলে যান এবং সেখান থেকেই অনার্স সম্পন্ন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চমৎকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর ও তাঁর ভাইয়ের জনপ্রিয়তার পথকে আরও সহজ করে দিয়েছিল।
পারিবারিক আবহ থেকেই মূলত রফিকুল আলমের সংগীতচর্চার শুরু। তাঁর বাবা ও চাচারা গান করতেন। তাঁর বড় ভাই সারওয়ার জাহান লক্ষ্ণৌ মরিস কলেজ থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত শিখে আসা ওস্তাদ হরিপদ দাসের কাছে গান শিখতেন। হরিপদ বাবু জমিদার পরিবারের সন্তান হওয়ায় গান শিখিয়ে কোনো টাকা নিতেন না। তাঁর কাছ থেকেই রফিকুল আলম শাস্ত্রীয় সংগীতের দীক্ষা নেন এবং চমৎকার ভজন ও নজরুলের গান শোনেন। পরে হরিপদ বাবুর ছাত্র নামকরা শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী আব্দুল জব্বার খানের কাছেও তালিম নেন তিনি, যার মাধ্যমে লঘু সংগীতের (লাইট মিউজিক) প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়।
ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর অবসরে রাজশাহী বেতারের ‘স্টুডেন্টস ফোরাম’ অনুষ্ঠানে লাইভ গান গাওয়ার সুযোগ পান রফিকুল আলম। আকরাম হোসেনের উপস্থাপনায় সেই অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত ‘যায় নিয়ে যায় আমায় আপন গানের টানে/ ঘর–ছাড়া কোন্ পথের পানে’ গেয়ে শোনান। গানটি শুনে মুগ্ধ হয়ে বেতারের তৎকালীন কর্মকর্তা সলিমুদ্দীন ও আব্দুল কাহার একটি বিশেষ অডিশনের ব্যবস্থা করেন। সেই অডিশনে পাস করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন, যদিও তখন আধুনিক গান গাওয়ার অনুমতি পাননি।
রাজশাহীতে থাকার সময় তিনি ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করেন। ’৬৯ সালের সেই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রফিকুল আলম অনার্সের ফলাফল হাতে পান। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করায় তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান বদরুদ্দীন উমর তাঁকে গানে বেশি সময় না দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেওয়ার পর তাঁর মানসিক ও সংগীতের ধারায় বড় পরিবর্তন আসে। রবীন্দ্রসংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি আধুনিক গানের চর্চা শুরু করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি এমএ পরীক্ষায় চতুর্থ হন। তাঁর শিক্ষক ডক্টর তালুকদার মনিরুজ্জামান তাঁকে পিএইচডি থিসিসের আবেদন করতে এবং সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে প্রখ্যাত ফোকলোরিস্ট ও বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক ডক্টর মাজহারুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তাঁকে পরবর্তী মাসে ঢাকা যাওয়ার ডাক দেন, যা তাঁর জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে।



























