ঢাকা ০২:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আফগানিস্তানের ১০টি লক্ষ্যবস্তুতে পাকিস্তানের বিমান ও ড্রোন হামলা দাউদকান্দি থানায় ১৭ কিশোরের পালানোর অভিযোগ, অস্বীকার পুলিশের বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি করল বিমান বাংলাদেশ গ্রাম ও শহর: জীবনযাত্রার ভিন্নতা, শিশুদের স্বাস্থ্যে এগিয়ে গ্রাম উখিয়ায় বিজিবিকে লক্ষ্য করে গুলি, দেড় লাখ ইয়াবা উদ্ধার আজ বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস হরমুজ প্রণালীতে আটকে পড়া বাংলাদেশি জাহাজ উদ্ধারে ইরানের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী হরমুজ প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্রকে ৫ দিনের আলটিমেটাম দিল ইরান জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ও বাড়তি চাপ লোক দেখানো ইবাদত থেকে বাঁচার উপায় ও করণীয়

লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে ফেরা দুই বাংলাদেশির দুঃসহ অভিজ্ঞতার গল্প

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১২:৩৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



‘ভাতের দিকেই চাইয়া ছিলাম ভাই, মুখে কী দিব? বিমানে ভাত দেইখাই পেট ভরে গেছে।’ লিবিয়া থেকে দীর্ঘ বন্দিজীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পথে ৪৫ দিন পর বিমানে ভাত পেয়ে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা জানালেন মশিউর রহমান। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ত্রিপলির তাজুরা বন্দিশিবির থেকে বুরাক এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় মোট ১৭৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে মশিউর রহমান ও সোহেল মিয়া বিমানবন্দরে নেমে গুলিস্তানগামী বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন।

মাদারীপুরের কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের ৩৮ বছর বয়সী মশিউর রহমানের নিজের খাবারের হোটেল ছিল। ছোট ভাই ইতালিতে থাকায় তিনিও ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। পরিবার ও ভাইয়ের অমতেই গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি যাত্রা শুরু করেন। প্রথম ট্রানজিট ছিল মালয়েশিয়ায় ১২ ঘণ্টার, এরপর শ্রীলঙ্কায় ২ দিন, এরপর কুয়েতে ২ ঘণ্টার ট্রানজিট পার করে তিনি মিসরে পৌঁছান। মশিউরের এ যাত্রা ছিল দীর্ঘ ৯ মাসের। লিবিয়ায় বন্দী করা বা মারধরের ভয় দেখিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ফোনে হুমকি দেওয়া হতো, সেই ভয়ে মশিউরের পরিবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করে দালালের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। প্রথম দফায় ১৭ লাখ এবং পরে ১২ লাখ টাকা তিনি দালালের হাতে তুলে দেন। অবশেষে তিন মাস আগে খমস থেকে কাঠের নৌকায় ৩০ বাংলাদেশি ও ৪ মিসরীয়কে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া শুরু হয়। লিবিয়ার আল-খমসে পৌঁছানোর পর দালালদের বিভিন্ন ধাপে টাকা দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত তিনি লিবীয় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এরপর তাকে ত্রিপলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে ৪৫ দিন বন্দী রাখা হয়। মশিউরের বর্ণনায়, সেখানে ২০০ জনের কক্ষে ৫০০ জনকে রাখা হতো এবং নাইজেরিয়ান তদারককারীরা সামান্য কারণে লম্বা পাইপ দিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালাত। ৪৫ দিনে এক বেলাও পেট ভরে ভাত খেতে পারেননি তিনি; কলের লোনা পানি পান করেই তাদের বেঁচে থাকতে হয়েছে। অবশেষে গত ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) পক্ষ থেকে মশিউরের দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ৩১ আগস্ট, সোমবার লিবিয়ার স্থানীয় সময় বেলা ২টার দিকে বিমানে ওঠেন তিনি।

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটের ৩৬ বছর বয়সী সোহেল মিয়াও একই ধরনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার শিকার। অটোরিকশা চালক সোহেল উন্নত জীবনের আশায় ১৪ মাস আগে বাড়ি ছাড়েন। তিনি দালালদের হাতে মোট ৩৯ লাখ টাকা তুলে দেন, যার জন্য তার পরিবারকে পৈতৃক জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। খমস থেকে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় তিনি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাজুরা বন্দিশিবিরে ৪৮ দিন পার করেছেন সোহেল। সেখানে প্রচণ্ড গরমে দমবন্ধ পরিবেশে কাটানো দিনগুলোতে তিনি কোরবানির ঈদের দিনটিও পাস্তার ওপর নির্ভর করে কাটিয়েছেন।

দেশে ফেরার পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের সাথে কথা বলেছে এবং দালালের বিরুদ্ধে আইনগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। সোহেল আর কখনোই বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না; তিনি এখন দেশে অটোরিকশা চালিয়ে উপার্জনের পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে, মশিউরের মাথায় সুদের ঋণের বিশাল বোঝা থাকলেও তিনি আপাতত গ্রামে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। দালালের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হওয়া এই দুই তরুণ এখন অন্য বাংলাদেশিদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে ফেরা দুই বাংলাদেশির দুঃসহ অভিজ্ঞতার গল্প

আপডেট সময় : ১২:৩৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘ভাতের দিকেই চাইয়া ছিলাম ভাই, মুখে কী দিব? বিমানে ভাত দেইখাই পেট ভরে গেছে।’ লিবিয়া থেকে দীর্ঘ বন্দিজীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পথে ৪৫ দিন পর বিমানে ভাত পেয়ে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা জানালেন মশিউর রহমান। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ত্রিপলির তাজুরা বন্দিশিবির থেকে বুরাক এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় মোট ১৭৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে মশিউর রহমান ও সোহেল মিয়া বিমানবন্দরে নেমে গুলিস্তানগামী বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন।

মাদারীপুরের কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের ৩৮ বছর বয়সী মশিউর রহমানের নিজের খাবারের হোটেল ছিল। ছোট ভাই ইতালিতে থাকায় তিনিও ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। পরিবার ও ভাইয়ের অমতেই গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি যাত্রা শুরু করেন। প্রথম ট্রানজিট ছিল মালয়েশিয়ায় ১২ ঘণ্টার, এরপর শ্রীলঙ্কায় ২ দিন, এরপর কুয়েতে ২ ঘণ্টার ট্রানজিট পার করে তিনি মিসরে পৌঁছান। মশিউরের এ যাত্রা ছিল দীর্ঘ ৯ মাসের। লিবিয়ায় বন্দী করা বা মারধরের ভয় দেখিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ফোনে হুমকি দেওয়া হতো, সেই ভয়ে মশিউরের পরিবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করে দালালের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। প্রথম দফায় ১৭ লাখ এবং পরে ১২ লাখ টাকা তিনি দালালের হাতে তুলে দেন। অবশেষে তিন মাস আগে খমস থেকে কাঠের নৌকায় ৩০ বাংলাদেশি ও ৪ মিসরীয়কে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া শুরু হয়। লিবিয়ার আল-খমসে পৌঁছানোর পর দালালদের বিভিন্ন ধাপে টাকা দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত তিনি লিবীয় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এরপর তাকে ত্রিপলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে ৪৫ দিন বন্দী রাখা হয়। মশিউরের বর্ণনায়, সেখানে ২০০ জনের কক্ষে ৫০০ জনকে রাখা হতো এবং নাইজেরিয়ান তদারককারীরা সামান্য কারণে লম্বা পাইপ দিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালাত। ৪৫ দিনে এক বেলাও পেট ভরে ভাত খেতে পারেননি তিনি; কলের লোনা পানি পান করেই তাদের বেঁচে থাকতে হয়েছে। অবশেষে গত ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) পক্ষ থেকে মশিউরের দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ৩১ আগস্ট, সোমবার লিবিয়ার স্থানীয় সময় বেলা ২টার দিকে বিমানে ওঠেন তিনি।

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটের ৩৬ বছর বয়সী সোহেল মিয়াও একই ধরনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার শিকার। অটোরিকশা চালক সোহেল উন্নত জীবনের আশায় ১৪ মাস আগে বাড়ি ছাড়েন। তিনি দালালদের হাতে মোট ৩৯ লাখ টাকা তুলে দেন, যার জন্য তার পরিবারকে পৈতৃক জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। খমস থেকে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় তিনি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাজুরা বন্দিশিবিরে ৪৮ দিন পার করেছেন সোহেল। সেখানে প্রচণ্ড গরমে দমবন্ধ পরিবেশে কাটানো দিনগুলোতে তিনি কোরবানির ঈদের দিনটিও পাস্তার ওপর নির্ভর করে কাটিয়েছেন।

দেশে ফেরার পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের সাথে কথা বলেছে এবং দালালের বিরুদ্ধে আইনগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। সোহেল আর কখনোই বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না; তিনি এখন দেশে অটোরিকশা চালিয়ে উপার্জনের পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে, মশিউরের মাথায় সুদের ঋণের বিশাল বোঝা থাকলেও তিনি আপাতত গ্রামে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। দালালের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হওয়া এই দুই তরুণ এখন অন্য বাংলাদেশিদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo