
‘ভাতের দিকেই চাইয়া ছিলাম ভাই, মুখে কী দিব? বিমানে ভাত দেইখাই পেট ভরে গেছে।’ লিবিয়া থেকে দীর্ঘ বন্দিজীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পথে ৪৫ দিন পর বিমানে ভাত পেয়ে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা জানালেন মশিউর রহমান। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ত্রিপলির তাজুরা বন্দিশিবির থেকে বুরাক এয়ারের বিশেষ ফ্লাইটে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় মোট ১৭৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে মশিউর রহমান ও সোহেল মিয়া বিমানবন্দরে নেমে গুলিস্তানগামী বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন।
মাদারীপুরের কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের ৩৮ বছর বয়সী মশিউর রহমানের নিজের খাবারের হোটেল ছিল। ছোট ভাই ইতালিতে থাকায় তিনিও ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। পরিবার ও ভাইয়ের অমতেই গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি যাত্রা শুরু করেন। প্রথম ট্রানজিট ছিল মালয়েশিয়ায় ১২ ঘণ্টার, এরপর শ্রীলঙ্কায় ২ দিন, এরপর কুয়েতে ২ ঘণ্টার ট্রানজিট পার করে তিনি মিসরে পৌঁছান। মশিউরের এ যাত্রা ছিল দীর্ঘ ৯ মাসের। লিবিয়ায় বন্দী করা বা মারধরের ভয় দেখিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ফোনে হুমকি দেওয়া হতো, সেই ভয়ে মশিউরের পরিবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করে দালালের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়। প্রথম দফায় ১৭ লাখ এবং পরে ১২ লাখ টাকা তিনি দালালের হাতে তুলে দেন। অবশেষে তিন মাস আগে খমস থেকে কাঠের নৌকায় ৩০ বাংলাদেশি ও ৪ মিসরীয়কে নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া শুরু হয়। লিবিয়ার আল-খমসে পৌঁছানোর পর দালালদের বিভিন্ন ধাপে টাকা দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত তিনি লিবীয় সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এরপর তাকে ত্রিপলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে ৪৫ দিন বন্দী রাখা হয়। মশিউরের বর্ণনায়, সেখানে ২০০ জনের কক্ষে ৫০০ জনকে রাখা হতো এবং নাইজেরিয়ান তদারককারীরা সামান্য কারণে লম্বা পাইপ দিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালাত। ৪৫ দিনে এক বেলাও পেট ভরে ভাত খেতে পারেননি তিনি; কলের লোনা পানি পান করেই তাদের বেঁচে থাকতে হয়েছে। অবশেষে গত ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) পক্ষ থেকে মশিউরের দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ৩১ আগস্ট, সোমবার লিবিয়ার স্থানীয় সময় বেলা ২টার দিকে বিমানে ওঠেন তিনি।
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটের ৩৬ বছর বয়সী সোহেল মিয়াও একই ধরনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার শিকার। অটোরিকশা চালক সোহেল উন্নত জীবনের আশায় ১৪ মাস আগে বাড়ি ছাড়েন। তিনি দালালদের হাতে মোট ৩৯ লাখ টাকা তুলে দেন, যার জন্য তার পরিবারকে পৈতৃক জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। খমস থেকে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার সময় তিনি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাজুরা বন্দিশিবিরে ৪৮ দিন পার করেছেন সোহেল। সেখানে প্রচণ্ড গরমে দমবন্ধ পরিবেশে কাটানো দিনগুলোতে তিনি কোরবানির ঈদের দিনটিও পাস্তার ওপর নির্ভর করে কাটিয়েছেন।
দেশে ফেরার পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের সাথে কথা বলেছে এবং দালালের বিরুদ্ধে আইনগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। সোহেল আর কখনোই বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না; তিনি এখন দেশে অটোরিকশা চালিয়ে উপার্জনের পরিকল্পনা করছেন। অন্যদিকে, মশিউরের মাথায় সুদের ঋণের বিশাল বোঝা থাকলেও তিনি আপাতত গ্রামে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। দালালের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হওয়া এই দুই তরুণ এখন অন্য বাংলাদেশিদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাহের আহমেদ, প্রধান সম্পাদক: মোঃ মোত্তালিব সরকার। প্রকাশক কর্তৃক ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় (ঢাকা) : ৫৫০বি, হজ্জ ক্যাম্প রোড, আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। আঞ্চলিক কার্যালয় (বগুড়া): টোলারগেট, শেরপুর–৫৮৪০, শেরপুর, বগুড়া। অফিস: ০১৭৭৬-১৩৬০৫০ (হোয়াটসঅ্যাপ), বিজ্ঞাপন: ০৯৬৯৭-৫৪৪৮২৭। ই-মেইল: dailyjokhonsomoy@gmail.com।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত ©সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক যখন সময় ২০২২