ডিজিটাল দৌড়ে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ, আইটিইউর সূচকে নেপথ্যের কারণ

- আপডেট সময় : ০২:৫৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরার ৬৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী সাইদ উদ্দীন (ছদ্মনাম) নিয়মিত স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ফেসবুক বা ইউটিউবে ভিডিও দেখা তাঁর দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হলেও, একই ফোন দিয়ে অনলাইন ব্যাংকিং, সরকারি সেবা গ্রহণ কিংবা কৃষিতথ্য জানার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তাঁর অজানা। সাইদ উদ্দীনের মতো এমন অসংখ্য ব্যবহারকারীর অস্তিত্বই দেশের ডিজিটাল অগ্রগতির পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) সর্বশেষ ডিজিটাল অগ্রগতি সূচকে।
চলতি মাসে প্রকাশিত এই সূচকে ১৫৯টি দেশের আইসিটি পরিষেবার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আইটিইউর বিশ্লেষণ বলছে, যেসব দেশ ডিজিটাল দৌড়ে এগিয়েছে, সেখানে মানুষ শুধু নেটওয়ার্কের আওতাভুক্তই হয়নি, বরং সেই নেটওয়ার্ককে শিক্ষা, ব্যবসা, আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি সেবার কাজে সফলভাবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশে নেটওয়ার্কের বিস্তার দ্রুত হলেও ডিজিটাল অর্থনীতির পরিধি বাড়ার গতি এখনো ধীর।
সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৬৮ দশমিক ৯, যা গত বছরের ৬৪ দশমিক ৯ থেকে ৬ শতাংশ বেশি। গত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় লাফ হলেও, বাংলাদেশ এখনো ভিয়েতনাম (৮৮ দশমিক ৪), ভুটান (৮৬ দশমিক ৪), কম্বোডিয়া (৭৮ দশমিক ৭), শ্রীলঙ্কা (৭৩ দশমিক ২) এবং মিয়ানমারের (৭১ দশমিক ৬) চেয়ে পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের নিচে রয়েছে পাকিস্তান (৬৭ দশমিক ৭) এবং আফগানিস্তান (৩৬ দশমিক ২)। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় স্কোর যেখানে ৬৯, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান তার চেয়েও নিচে।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির মনে করেন, দেশে অবকাঠামো, অটোমেশন ও সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়লেও আন্তর্জাতিক সূচকে এর প্রতিফলন ঘটছে না। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো গড়লেই চলবে না, বরং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়, সেবাপ্রাপ্তি সহজ করা এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, সরকারি-বেসরকারি সেবার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং মানুষের ব্যবহার–দক্ষতার ঘাটতিই এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রায় পুরো জনসংখ্যা ফোর-জি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকলেও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। আইটিইউর তথ্যমতে, দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এছাড়া ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। আইটিইউ ডিজিটাল অগ্রগতিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে—'অর্থবহ সংযোগ', যেখানে বাংলাদেশের স্কোর ৮৭ দশমিক ১ এবং 'সর্বজনীন সংযোগ', যেখানে স্কোর মাত্র ৫০ দশমিক ৬। বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামো থাকলেও সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে, লেখাপড়ায় বা ব্যবসায় এর ব্যবহার না হওয়ায় একটি 'ইউসেজ গ্যাপ' বা ব্যবহারে ফারাক তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, স্কোর বাড়া ভালো লক্ষণ, তবে এখন সময় এসেছে আইসিটি অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে নাগরিক পরিষেবার মান বাড়ানো এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে সব স্তরের মানুষকে এই অগ্রযাত্রায় যুক্ত করার। আইটিইউর প্রতিবেদনে সাইদ উদ্দীনের মতো যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না, তাদের আওতাভুক্ত করার পাশাপাশি ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের বিস্তার এবং ডিজিটাল দক্ষতা ও সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে ডিজিটাল লেনদেন করেন ৩৪ শতাংশ মানুষ।
























