যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ৬ মাস: লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ ওয়াশিংটন, অনিশ্চিত মধ্যপ্রাচ্য
- আপডেট সময় : ০৪:০৪:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরানবিরোধী যুদ্ধের ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। তবে ওয়াশিংটনের প্রাথমিক প্রত্যাশা অনুযায়ী তেহরানের শাসনব্যবস্থায় কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন বা সরকার পতন ঘটেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট কোনো বিজয় আসার সম্ভাবনা নেই, বরং মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, ইরানের ওপর তীব্র অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করলে দেশটির শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। কিন্তু ছয় মাস পর এসে সেই হিসাব মিলছে না। উল্টো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সামাল দিতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিভিন্ন পক্ষ। চলমান উত্তেজনার মধ্যেই গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়, যার ফলে যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমলেও তা বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহে। গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়ে অনেক কমে গেছে। ইরানি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং জাহাজে ইরানের হামলার জেরে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে এবং তেলনির্ভর দেশগুলো এখনো এই সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে মার্কিন বাহিনী।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান অন্যান্য সংকটও নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যকার উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে, ভারত ও চীনের মতো বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের গতি কিছুটা শ্লথ হলেও তা পুরোপুরি থেমে যায়নি। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেবল বাইরের শক্তির সঙ্গে জোট থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও সামরিক চুক্তির পথ সুগম করতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিন্তনপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল আল–জাজিরাকে বলেন, এই যুদ্ধ মূলত আগে থেকে চলে আসা প্রবণতাগুলোর গতি বাড়িয়েছে, নতুন কোনো ধারার জন্ম দেয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই তাদের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছিল এবং মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে গিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও অংশীদারত্ব বাড়ানোর কথা ভাবছিল।
অন্যদিকে, রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) বিশ্লেষক এইচ এ হেলিয়ার আল–জাজিরাকে জানান, চলতি বছর ইরানকে পরাস্ত করতে না পারলেও ইসরায়েল এই অঞ্চলে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। তেহরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আগামী ছয় মাসে ইরানে সরকার পতনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাত্ত্বিকভাবে যদি পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে এবং অর্থনৈতিক চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে কয়েক বছরের ব্যবধানে হয়তো ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। তবে কয়েক মাসের মধ্যে এমন কিছু ঘটার সুযোগ নেই এবং সবকিছু একই রকম থাকবে বলেও মনে হয় না।



























