ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর তথ্যের নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা
- আপডেট সময় : ০১:০৫:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

একজন রোগী যখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন, তখন তিনি তাঁর রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট, ওষুধের বিবরণ ও ব্যক্তিগত পরিচয়সহ অনেক সংবেদনশীল তথ্য প্রদান করেন। অতীতে এসব তথ্য কাগজের নথিতে সংরক্ষিত থাকলেও বর্তমানে ডিজিটাল ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড এবং ডিজিটাল ইমেজিংয়ের মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এই রূপান্তর চিকিৎসাসেবার কার্যকারিতা বাড়ালেও রোগীর তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নতুন দায়িত্ব তৈরি করেছে। রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য সাধারণ কোনো তথ্য নয়; এটি তাঁর গোপনীয়তা, মর্যাদা ও অধিকারের সাথে সরাসরি জড়িত।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসক, ল্যাবরেটরি, রেডিওলজি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীরা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় রোগীর তথ্যের সাথে যুক্ত থাকেন। এই সমন্বয় চিকিৎসাসেবা সহজ করলেও তথ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র সফটওয়্যার বা ডিজিটাল রেকর্ড চালু করাই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য শক্তিশালী প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব অনুযায়ী তথ্য ব্যবহারের অনুমতি, নিরাপদ লগইন ব্যবস্থা, নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাই এবং কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রযুক্তি, প্রক্রিয়া এবং মানুষের আচরণের মধ্যে সমন্বয় থাকলেই কেবল এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তথ্যের ঝুঁকি শুধু বড় ধরনের সাইবার হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দৈনন্দিন কাজের অসতর্কতা থেকেও বড় বিপদ ঘটতে পারে। অনুমতি ছাড়া রিপোর্ট শেয়ার করা, ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা, অনিরাপদ মাধ্যমে নথি আদান-প্রদান কিংবা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশের মতো আচরণ তথ্যের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই প্রতিটি কর্মীকে তথ্যের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের উচিত নিয়মিত কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তথ্য ব্যবহারের নীতিমালা পরিষ্কার রাখা।
রোগীর আস্থা অর্জনে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। হাসপাতালের উচিত রোগীর তথ্য কেন সংগ্রহ করা হচ্ছে, কীভাবে ব্যবহার করা হতে পারে এবং কারা তা দেখতে পারবেন, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া। পাশাপাশি তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, গোপনীয়তার নীতি এবং রোগীর সম্মতির প্রয়োজনীয়তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব বলেই সব তথ্য সব ব্যবস্থায় ব্যবহার করা উচিত নয়; বরং কোন তথ্য প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন এবং সেটি নিরাপদে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা আগে বিবেচনা করতে হবে।
হাসপাতালের নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো তথ্য ব্যবস্থাপনায় নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আইটি বিভাগের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা, নার্সিং, প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগকে নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত শনাক্তকরণ ও ঝুঁকি কমানোর প্রক্রিয়াও প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত সাফল্য কেবল দ্রুত তথ্য প্রাপ্তিতে নয়, বরং রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। ভবিষ্যতে সেই হাসপাতালই শক্তিশালী হবে, যারা উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি রোগীর গোপনীয়তা ও তথ্যের নিরাপত্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ করে তুলতে পারবে।




























