খাবারে বিষ ও মলের জীবাণু, চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পুরো দেশ

- আপডেট সময় : ০৬:১৬:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

দেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকা প্রায় সব ধরনের খাবার ও পণ্যে ভয়াবহ মাত্রায় বিষ, ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নমুনা পরীক্ষা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে এই নীরব ঘাতক দেহে প্রবেশ করায় ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের রোগসহ নানা জটিল ব্যাধি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
বিএফএসএর পরীক্ষায় খাবার পানি ও শাকসবজিতেও মারাত্মক দূষণ পাওয়া গেছে। দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ, খাগড়াছড়িতে ৬০ সিএফইউ এবং বাগেরহাটে ৪৩ সিএফইউ ফিকাল কলিফর্ম বা মলের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ জানান, নিরাপদ পানিতে এই জীবাণু শূন্য থাকার কথা। ফিকাল কলিফর্মযুক্ত পানি পান করলে আমাশয়, ডায়রিয়া, টাইফয়েডসহ নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে, যার মধ্যে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
সুস্থ থাকতে চিকিৎসকেরা দৈনন্দিন খাবারে সবজির উপস্থিতি বাড়াতে বললেও এই সবজিই এখন শরীর অসুস্থের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজার ও এলাকা থেকে সবজির নমুনা সংগ্রহ করে ১.১৬-২.৩৭ পিপিএম মাত্রার সিসার অস্তিত্ব মিলেছে। এছাড়া নমুনায় ক্যাডমিয়াম (০.৩৩ পিপিএম) পাওয়া গেছে, যেখানে শাকসবজিতে সিসার স্বাভাবিক মাত্রা ০.৩ পিপিএম থাকার কথা। সবজির কিছু নমুনায় ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম ও সালমোনেলা জীবাণুর উপস্থিতিও মিলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসা ও ক্যাডমিয়াম কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করে এবং শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজশাহী ও গাজীপুরের গুড়ে নিষিদ্ধ রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট এবং রংপুর, বান্দরবান, নরসিংদী, সুনামগঞ্জ, বগুড়া, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর ও সাতক্ষীরা থেকে সংগৃহীত মুড়ির নমুনায় অননুমোদিত ইউরিয়া মেশানো হচ্ছে। এছাড়া, সরিষার তেলে উচ্চমাত্রার অ্যাসিড এবং সয়াবিন তেলের নমুনায় ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি ও অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিভিন্ন এলাকার লবণে আয়োডিনের অসমতা এবং হলুদ-মরিচের গুঁড়ায় নিম্নমানের উপাদানের উপস্থিতি মিলেছে।
খুলনা থেকে সংগৃহীত মধুতে অতিরিক্ত সুক্রোজ, গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ এবং রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘিয়ে মিল্ক ফ্যাটের অনুপস্থিতি ধরা পড়েছে, যা আসল ঘির মান পূরণ করে না। বরিশালের গুঁড়ো দুধে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোমল পানীয়, কৃত্রিম জুস ও ফলের পানীয়তে অতিরিক্ত বেনজোয়িক অ্যাসিড, টারট্রাজিন ও ক্যাফেইন ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডায়েটিশিয়ান সিরাজাম মুনিরা বলেন, দুধ, মাছ, মাংস, ফল ও শাকসবজিতে ভেজালের কারণে অ্যালার্জি, সংক্রমণসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগ বাড়ছে। অতি মুনাফার লোভে মাছে-মাংস ও মসলায় ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে, জিলাপিতে দেওয়া হচ্ছে হাইড্রোজ এবং ফ্লেভার ও কাপড়ের রং মিশিয়ে জুস বানানো হচ্ছে। এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএফএসএ, বিএসটিআই ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে হওয়া ওই সভায় তিন সদস্যের এই কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।




























