প্রবাসী মা ও সন্তানদের মানসিক সংকট: একাকিত্বের অর্থনীতি ও বাস্তবতা
- আপডেট সময় : ০৭:৫৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

মায়ের কোল ছেড়ে দূরে থাকা সন্তানদের শৈশব যেন কেবলই এক দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর। উন্নত জীবন ও পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার স্বপ্ন নিয়ে অনেক মা যখন বিদেশে পাড়ি জমান, তখন তাদের সন্তানেরা এক গভীর একাকিত্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে যায়। অসুস্থতা কিংবা স্কুলের অভিভাবক সভায় মাকে পাশে না পাওয়ার অভাব তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক শিশু তাদের মনের কষ্ট প্রকাশ করতে না পেরে সংকোচ বোধ করে, আবার অনেকেই বিরক্তি বা অস্থিরতা প্রদর্শন করে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের শৈশবকে বিষিয়ে তোলে।
এই পরিস্থিতি কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে 'একাকিত্বের অর্থনীতি'। যখন পরিবারের কোনো সদস্যের অনুপস্থিতিজনিত অভাব পূরণ করতে কেবল অর্থের ওপর নির্ভর করা হয়, তখন তা শিশুর আবেগীয় চাহিদাকে উপেক্ষা করে। সরকারি সংস্থা বিএমইটি-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখের বেশি নারী জীবিকার তাগিদে দেশ ছাড়েন, যাদের একটি বড় অংশই বিবাহিত ও সন্তানসম্পন্ন মা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রবাসী পুরুষকর্মীদের তুলনায় নারী কর্মীরা তাদের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই দেশে পাঠিয়ে দেন। এই অর্থ দরিদ্র পরিবারগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণ, পুষ্টিকর খাবার ও পড়াশোনার খরচ জোগাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এছাড়া নারীদের পাঠানো অর্থে বাড়িঘর নির্মাণ ও ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তবে মায়ের দীর্ঘ অনুপস্থিতি শিশুদের পড়াশোনায় অমনোযোগিতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সঠিক তদারকির অভাবে এই শিশুরা কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়া কিংবা মাদকের মতো মরণব্যাধিতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়া মায়ের পাঠানো অর্থ যদি সন্তানের প্রয়োজনে সঠিকভাবে ব্যয় না হয়, তবে তা তাদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই পরিস্থিতি পরিবারে অস্থিরতা, সমাজে নানা সমস্যা এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
এই সংকট নিরসনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বিদেশে কর্মরত মায়ের সঙ্গে সন্তানদের নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদের যত্নশীল হতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রবাসী মায়েদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের নিয়মিত তদারকির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ডেটাবেস তৈরি করা প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের মানসিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া ও প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে শিশুদের উচ্চশিক্ষা ও সুরক্ষার বিশেষ সঞ্চয় প্রকল্প চালু করা এবং দেশে নারীদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি একটি মানবিক সমাজ গড়তে প্রবাসী মায়েদের অর্থনৈতিক অবদানের মূল্যায়নের পাশাপাশি তাদের সন্তানদের শৈশব সুরক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।




























