কঠোর হচ্ছে ইউরোপের অভিবাসন নীতি, বাংলাদেশিদের বৈধ হওয়ার পথ সংকুচিত
- আপডেট সময় : ০৬:৩৮:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের তরুণদের, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের যুবকদের কাছে ইউরোপ বরাবরই একটি স্বপ্নের গন্তব্য। দেশে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের অভাব, কম আয় এবং সচ্ছল জীবনের প্রত্যাশায় অনেকেই এসএসসি বা এইচএসসি পাস করেই ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু অনিয়মিত উপায়ে ইউরোপে গিয়ে পরবর্তীতে বৈধ হওয়ার যে প্রচলিত ধারণা ছিল, তা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন কঠোর অভিবাসন নীতি এবং বিভিন্ন দেশের আইন পরিবর্তনের কারণে এই স্বপ্ন এখন অনেকের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ২০২৬ সালের ১২ জুন থেকে কার্যকর হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন 'প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম' (Pact on Migration and Asylum)। এটি মূলত অভিবাসন ও আশ্রয়ব্যবস্থা সংস্কারের ১০টি আইনি কাঠামোর একটি সমন্বিত রূপ। এর অধীনে ইউরোপের সীমানায় আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের নিবন্ধন, পরিচয় যাচাই এবং দ্রুত আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন 'নিরাপদ উৎসদেশ'-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনগুলো এখন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরীক্ষা করে বাতিল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলাম (ইইউএএ)-এর সর্বশেষ বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে প্রায় ৩৭ হাজার বাংলাদেশি আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এই আবেদনের সংখ্যা ১৫ শতাংশ কম হলেও আবেদনকারীদের তালিকায় বাংলাদেশিরা চতুর্থ স্থানে ছিলেন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৫ সালে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের প্রথম দফায় আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বা বৈধতা পাওয়ার হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, সিংহভাগ আবেদনই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং তারা সেখানে অবৈধ হিসেবে থাকার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে নতুন করে ‘কাগজ’ করার পুরোনো কৌশলটিও এখন আর কাজ করছে না। অতীতে ইতালি বা ফ্রান্সে নিয়মিত হতে না পারলে অনেকে পর্তুগাল বা স্পেনে গিয়ে বৈধ হওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু বর্তমানে শেনজেন ইনফরমেশন সিস্টেম (এসআইএস) বা এসআইএস অ্যালার্টের মতো অভিন্ন ডাটাবেস ব্যবহারের ফলে এক দেশের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা বা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত অন্য দেশের কর্তৃপক্ষও সহজেই দেখতে পারে। তবে ফ্রান্সের প্রশাসনিক নির্দেশ ‘ওকিউটিএফ’ (OQTF) বা ফ্রান্সে ফেরার নিষেধাজ্ঞা ‘আইআরটিএফ’ (IRTF) এবং এসআইএস অ্যালার্ট এক বিষয় নয়। প্রতিটি ওকিউটিএফ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো শেনজেন এলাকায় তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা তৈরি করে না, তবে এর ফলে আগের ইতিহাস আড়াল করে অন্য দেশে বৈধ হওয়ার পথ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে।
একসময় বাংলাদেশিদের বৈধ হওয়ার জনপ্রিয় গন্তব্য পর্তুগালেও সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। দেশটিতে কাজ শুরু করে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার আইনি ভিত্তি ‘ম্যানিফেস্টেশন অব ইন্টারেস্ট’ (Manifestação de Interesse) ২০২৪ সালের ৪ জুন বাতিল করা হয়েছে। ফলে সেখানে গিয়ে কাজ করলেই সহজে কাগজ পাওয়া যাবে—এমন ধারণা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। এছাড়া, কোনো ইউরোপীয় নাগরিককে বিয়ে করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বসবাসের অনুমতি বা নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্টকাট পথটিও এখন কঠিন যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়ছে। প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কঠিন শর্ত পূরণ করা ছাড়া এখন আর বিয়ে করে বৈধ হওয়া সম্ভব নয়।
ইউরোপের দেশগুলো এখন অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইউরোস্ট্যাটের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৫০ জন তৃতীয় দেশের নাগরিককে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা ২০২৪ সালের চেয়ে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। একই বছরে ইউরোপে ৭ লাখ ১৯ হাজার ৩৯৫ জন তৃতীয় দেশের নাগরিককে অনিয়মিত অবস্থায় শনাক্ত করা হয়েছে, যার বড় অংশই জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে।
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ, বিশেষ করে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর প্রবণতা বাংলাদেশিদের মধ্যে এখনো লক্ষ্য করা যায়। ইইউএএ-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অনিয়মিতভাবে সীমান্ত পার হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশিরা শীর্ষ তালিকায় ছিলেন। এই পথটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও গত পাঁচ বছরে কতজন বাংলাদেশি সাগরে প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।
ইউরোপে বৈধভাবে পড়াশোনা, দক্ষ কর্মী বা পারিবারিক পুনর্মিলনের মতো আইনি পথগুলো এখনো উন্মুক্ত রয়েছে। তবে দালালের খপ্পরে পড়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে অনিয়মিত উপায়ে ইউরোপে প্রবেশ করে পরে কোনোভাবে বৈধ হয়ে যাওয়ার সুযোগ এখন প্রায় বন্ধ। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, কঠোর আশ্রয়নীতি এবং উন্নত তথ্য যাচাই ব্যবস্থার কারণে অবৈধ উপায়ে ইউরোপের স্বপ্ন দেখা এখন চরম অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। এর অন্যতম কারণ ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও অভিন্ন ডাটাবেস ব্যবহার। Schengen Information System বা SIS-এ নির্দিষ্ট ধরনের প্রত্যাবর্তন সিদ্ধান্ত এবং প্রবেশ বা অবস্থান নিষেধাজ্ঞার সতর্কতা সংরক্ষণ করা হয়। ফলে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন সতর্কতা থাকলে অন্য শেনজেন দেশের কর্তৃপক্ষও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই তথ্য দেখতে পারে।এ কারণে ফ্রান্সে অভিবাসন-সংক্রান্ত সমস্যা তৈরি হওয়ার পর স্পেন বা পর্তুগালে গিয়ে আগের ইতিহাস সম্পূর্ণ আড়াল করে নতুন করে বৈধ হওয়ার পথ আগের তুলনায় অনেক কঠিন।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। OQTF, IRTF এবং SIS alert এক জিনিস নয়। ফ্রান্সের OQTF হলো দেশ ছাড়ার প্রশাসনিক নির্দেশ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এর সঙ্গে IRTF, অর্থাৎ ফ্রান্সে ফেরার নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তির তথ্য SIS-এ কী ধরনের সতর্কতা হিসেবে রয়েছে, সেটিও আলাদা বিষয়। তাই প্রতিটি OQTF স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো শেনজেন এলাকায় তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা তৈরি করে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
সমুদ্রপথে যাওয়ার ঝুঁকি, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎলিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর চেষ্টা বাংলাদেশিদের একটি অংশের মধ্যে এখনো রয়েছে। EUAA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বহিঃসীমা অনিয়মিতভাবে অতিক্রমের ঘটনায় বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া নাগরিকত্বগুলোর মধ্যে ছিলেন, বিশেষ করে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটে।কিন্তু এই পথ ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। গত পাঁচ বছরে শুধু বাংলাদেশি নাগরিক কতজন ভূমধ্যসাগরে মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ জাতীয়তাভিত্তিক সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। তাই অনুমাননির্ভর কোনো সংখ্যা দিয়ে আতঙ্ক তৈরি করার বদলে নিশ্চিত তথ্যের মধ্যেই থাকা জরুরি।





























