শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
- আপডেট সময় : ১২:৪৭:১০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতির ওপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই বর্তমান সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি সংসদকে এ তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত কমিটি দেশের মানুষের সামনে যে শ্বেতপত্র বা হোয়াইট পেপার প্রকাশ করেছিল, তাতে অর্থনীতির বিষয়টি অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। সেই পেপারটি পর্যালোচনা করলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে। বর্তমান সরকার সেই শ্বেতপত্রকে ভিত্তি ধরেই পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত একক কোনো কারণে ঘটে না। প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই সমস্যা তৈরি করে। বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর ইতিমধ্যে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি), সঠিক ব্যয় প্রাক্কলন না হওয়া, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ধীরগতি, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া, দুর্বল মনিটরিং ও জবাবদিহিতা, অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাজেটের সামঞ্জস্যহীনতা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাবই এর জন্য দায়ী।
এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে তিনি জানান, এখন থেকে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করা এবং প্রকল্প প্রণয়ন ও সংশোধন সংক্রান্ত নির্দেশিকা সময়োপযোগী করতে সংশোধন করা হচ্ছে। এছাড়া চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড স্থাপন, নিয়মিত মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম দ্রুত করতে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। যেসব প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি, সেগুলোর বিলম্ব ও অনিয়মের কারণ নিরূপণ করে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেগুলোর উপযোগিতা বিবেচনা করে পুনর্বিন্যাস বা স্কোপ পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প না নিয়ে সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপির সম্প্রসারণ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, পিপিপি মডেলের প্রকল্পে গুরুত্বারোপ এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিতামূলক করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫ হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিল্পখাতে সাময়িক গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খনন করা হবে। এছাড়া দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪,৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক এবং ৪,২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হবে। সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং আহ্বান করা হয়েছে, যার দরপত্র দাখিলের সময়সীমা আগামী নভেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। স্থলভাগে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ প্রণয়নের কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আকস্মিক সংকট এড়াতে মহেশখালির কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়িতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোম টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ি টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে। এছাড়া পায়রা, মোংলা বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে নতুন একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।
ভোলার গ্যাস প্রসঙ্গে সুলতানা আহমেদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে আনতে হলে অন্তত সাত বছর সময় লাগবে। তাই সরকার সেখানে স্থানীয়ভাবে শিল্প কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোক্তা সেখানে গ্যাসভিত্তিক কারখানা স্থাপনের চেষ্টা করছেন, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে। এর বাইরেও দেশের স্বার্থে সেখানে একটি সার কারখানা স্থাপন এবং ৫০০ মেগাওয়াটের একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে সরবরাহের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এদিন বিকেল সাড়ে তিনটায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।




























