ইউএনওসহ ১৭ দপ্তরে তীব্র জনবল সংকট, তেঁতুলিয়ায় নাগরিক সেবা চরম ব্যাহত
- আপডেট সময় : ০১:২২:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

দেশের সর্ব উত্তরের সীমান্তবর্তী ও পর্যটন সম্ভাবনাময় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) অন্তত ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় কর্মচারীর অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক নাগরিক সেবা। কোথাও শীর্ষ পদটি দীর্ঘদিন ধরে খালি, আবার কোথাও একাধিক পদ শূন্য থাকায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে দাপ্তরিক কার্যক্রম।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পদটি গত ৬ জুলাই থেকে শূন্য রয়েছে। প্রথমে সদর উপজেলার ইউএনও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও বর্তমানে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস. এম. আকাশ ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে কাজ চালাচ্ছেন। তাছাড়া এই দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা নেই।
সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এখানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদটি শূন্য। এছাড়া জুনিয়র কনসালটেন্টের ১০টি পদের মধ্যে ৯টি, মেডিকেল অফিসারের ২৮টির মধ্যে ১৭টি, মিডওয়াইফের ২টি এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ১৯টির মধ্যে ৮টি পদই খালি পড়ে রয়েছে। আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. শাকিল রহমান জানান, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকট থাকলেও তারা সীমিত লোকবল নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
মহিলা বিষয়ক দপ্তরে কোনো কর্মকর্তা বা স্থায়ী কর্মচারী নেই। ২০২১ সাল থেকে পার্শ্ববর্তী আটোয়ারী উপজেলার কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন, যিনি সপ্তাহে মাত্র এক-দুই দিন আসেন। এর ফলে মাতৃত্বকালীন ভাতা, ভিডব্লিউবি, প্রশিক্ষণ, বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেলাই প্রশিক্ষণার্থী লুবানা আক্তার অভিযোগ করেন, ৫৯ দিনের ভাতার স্বাক্ষর নিলেও অফিসের কর্মচারী তাদের অর্ধেক টাকা দিচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তিনটি দপ্তরের দায়িত্বে থাকায় তাকে অফিসে পাওয়া যায় না, ফলে সমস্যার কথা কাউকে বলাও যাচ্ছে না।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে গত ৩০ জুলাই কর্মকর্তা স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়ার পর থেকে কোনো স্থায়ী কর্মকর্তা যোগ দেননি। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় জমি কেনাবেচা ও দলিল সম্পাদনে ভোগান্তি বাড়ছে, কমছে সরকারি রাজস্ব। কৃষি অফিসে অতিরিক্ত কৃষি অফিসারের ১টি, সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসারের ২টি এবং উপ-সহকারী কৃষি অফিসারের ১০টিসহ মোট ১২টি পদ শূন্য। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাবরিনা আফরিন জানান, এই সীমিত জনবল দিয়েই কৃষকদের সেবা দিতে হচ্ছে। লোকবল পেলে সেবার মান আরও বাড়ানো সম্ভব হতো।
এলজিইডি অফিসে সম্প্রতি প্রকৌশলী এলেও সহকারী প্রকৌশলীর ১টি, উপ-সহকারী প্রকৌশলীর ২টি ও নকশাকারকের ১টি পদ খালি। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য। পরিবার পরিকল্পনা অফিসে কর্মকর্তা ও সহকারী কর্মকর্তার উভয় পদই খালি। এছাড়া মৎস্য, সহকারী মৎস্য ও নির্বাচন কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্বে চলছে কাজ। গোবরা নদীতে বিষ প্রয়োগে মাছ মারার ঘটনায় মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করা হলে তারা আসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এটিকে প্রশাসনের কাজ বলে এড়িয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন আজিজনগর এলাকার বাসিন্দা শাহিনুর ইসলাম শাহীন।
আনসার-ভিডিপি, পরিসংখ্যান, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার এবং ফায়ার সার্ভিসেও কর্মকর্তা নেই। হিসাবরক্ষণ অফিস চলছে একজন অডিটর দিয়ে, যেখানে কর্মকর্তা রয়েছেন অতিরিক্ত দায়িত্বে। বাংলাবান্ধা, তিরনই ও দেবনগর ইউনিয়নে কোনো তহশিলদার নেই এবং বাংলাবান্ধা ইউপির সচিব পদটিও দীর্ঘদিন ধরে খালি। দেবনগর ইউপি সদস্য আব্দুল মমিন জানান, কর্মকর্তা না থাকায় জনপ্রতিনিধিদেরও দাপ্তরিক কাজে চরম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা নাইবুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এত বড় একটি উপজেলা কীভাবে ইউএনও ছাড়া চলে! যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের আর্থিক ক্ষমতা নেই। তিনি দ্রুত শূন্য পদে স্থায়ী জনবল নিয়োগের দাবি জানান।
ভারপ্রাপ্ত ইউএনও এস এম আকাশ বলেন, জনবল সংকটের কারণে দাপ্তরিক কাজের গতি কমে যাচ্ছে এবং সেবাগ্রহীতারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোসা. শুকরিয়া পারভীন জানান, ইউএনও না থাকার বিষয়টি তার জানা থাকলেও অন্য দপ্তরের এই চিত্র জানা ছিল না। তিনি দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

























