মোদি সরকারের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছেন বাম ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা
- আপডেট সময় : ০৩:১০:২০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ‘জেন–জি’ প্রজন্মের তীব্র আন্দোলনের প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছেন ২৯ বছর বয়সী বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি এখন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মোদি সরকার সম্প্রতি সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীকে সরাতে বাধ্য হওয়ার পর, ভোটার তালিকার বিতর্কিত সংশোধনের কারণে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নিয়েও তরুণরা মোদি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
নেহা বোরা অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সর্বভারতীয় সভাপতি। ছিপছিপে গড়নের এই নেত্রীর কণ্ঠস্বর বেশ গম্ভীর ও বলিষ্ঠ। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা অবস্থান ধর্মঘট করলে পুলিশ সহজেই তাঁদের ধরে ফেলে, কিন্তু নেহা আন্দোলনকারীদের ধরতে আসা নিরাপত্তা বাহিনীকে ফাঁকি দেওয়ার এক বিশেষ কৌশল রপ্ত করেছেন। তাঁর এই কৌশলী লড়াইয়ের কারণে সফটওয়্যার ডেভেলপাররা তাঁকে নিয়ে সুপার মারিও ধাঁচের ভিডিও গেম তৈরি করেছেন, যেখানে গেমের চরিত্র পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রতিবাদের রিলস লাখ লাখ মানুষ দেখছেন।
গত ১২ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে রাহুল গান্ধীর পদযাত্রায় নেহা বোরাকে দেখা গেছে। রাহুল গান্ধী ওই পদযাত্রায় তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পাশাপাশি নেহার কাঁধেও হাত রেখেছিলেন। নেহার রাজপথের রাজনীতি বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৯০ সালে গঠিত আইসা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন। দলটির উত্থান ঘটে ১৯৬৭ সালে পূর্ব ভারতে শুরু হওয়া মাওবাদী নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিদ্রোহের ধারায়, যা পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক বিদ্রোহ থেকে অনুপ্রেরণা পায়। ১৯৯০–এর দশকে দলটি সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় যুক্ত হয়। নেহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দানিশ আলীর মতে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিপ্লবী ভগত সিংয়ের প্রতিরোধ কৌশলগুলোই তারা এখনো অনুসরণ করে। ১৯৩১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ শাসকেরা ভগত সিংকে ফাঁসি দিয়েছিল।
নেহার রাজনৈতিক জাগরণ ঘটে ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। উত্তরাখণ্ডের খাতিমায় জন্ম নেওয়া নেহার পরিবার বিজেপির সক্রিয় সমর্থক হওয়ায় তাঁর সঙ্গে পরিবারের রাজনৈতিক মতাদর্শের দূরত্ব তৈরি হয়। তবে যন্তর মন্তরে টানা ২৩ দিন অনশন করার পর তাঁর মা এসে তাঁকে স্নেহের পরশে পায়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। নেহা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) নাট্যকলায় পোস্টডক্টরাল পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। জেএনইউর রাজনীতিতে আইসার তিন দশকের বেশি সময়ের প্রভাব রয়েছে।
১০ অক্টোবরের আন্দোলনের সময় যখন মোদি সরকার পুরো নয়াদিল্লি অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং অনেক ছাত্রনেতাকে বাড়িতে নজরবন্দী বা উড়োজাহাজ থেকে আটক করে, তখন নেহা পুলিশের নাগালের বাইরে ছিলেন। তিনি ইনস্টাগ্রাম লাইভে এসে অ্যানিমে ‘ওয়ান পিস’–এর টি–শার্ট পরে দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকায় উপস্থিত হন এবং কয়েক শ মানুষকে নিয়ে মিছিল করেন। পরে পুলিশ তাঁকে ভ্যানে তুলে নিলেও কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেয়। নেহা বিখ্যাত পাকিস্তানি শিল্পী নুসরাত ফতেহ আলী খানের কাওয়ালি শুনতে ভালোবাসেন এবং নিজেও ভালো গান করেন ও ডাফলি বাজাতে পারেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলীর মতে, আইসার মতো ছোট সংগঠনের পক্ষে সংসদীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলা চ্যালেঞ্জিং। তবে নেহা যে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তরুণ ভোটারদের মধ্যে সমর্থন গড়ে তুলছেন, তা স্পষ্ট। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ নেহাকে ‘গণতন্ত্রের দেবী’ হিসেবে অভিহিত করে হংকংয়ের আন্দোলনকারী নেত্রী অ্যাগনেস চাউয়ের সঙ্গে তুলনা করেন। যদিও নেহা নিজে এমন তুলনা চান না। আসিম আলীর মন্তব্য, নেহা ক্ষণিকের কোনো চমক নন, তিনি রাজনীতিতে থেকে যাবেন এবং নতুন একটি জায়গা তৈরি করছেন।


























