ঢাকা ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
আখাউড়া প্রশাসনে বহিরাগত ‘পাবলিক পেশকার’ আমজাদের দাপট বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট ও চ্যাম্পিয়নস লিগের আজকের সূচি আজ ৫৭তম বিশ্ব মান দিবস: সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে জোর ময়মনসিংহে স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকার মারামারির ভিডিও ভাইরাল দুর্যোগ মোকাবিলায় তালতলীতে ৬০ স্বেচ্ছাসেবককে বিশেষ প্রশিক্ষণ বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা পেতে আলোচনা চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএমএলে ১২টি ভাষা শেখার সুযোগ ৩৬ বছর বয়সে না ফেরার দেশে জিম্বাবুয়ের আম্পায়ার সারাহ বিএনপিকেও শেখ হাসিনার ভূতে ধরেছে: মামুনুল হক মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স নিয়ে শঙ্কা

আহসান মঞ্জিলের ৫ সিন্দুক: ৩টির রহস্য এখনো অমীমাংসিত

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৯:০০:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক বাসভবন আহসান মঞ্জিল বর্তমানে একটি জাদুঘর। এই জাদুঘরের ৯ নম্বর গ্যালারিতে নবাববাড়ির ব্যবহৃত পাঁচটি বিশালাকার লোহার সিন্দুক সংরক্ষিত রয়েছে। একসময় এগুলো নবাব পরিবারের কেন্দ্রীয় ভল্ট বা ব্যক্তিগত কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পাঁচটি সিন্দুকের মধ্যে তিনটি এখনো খোলা হয়নি, যা নিয়ে পুরান ঢাকায় নানা গল্প প্রচলিত আছে। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের উপকিপার দিবাকর সিকদার জানান, তালাবদ্ধ সিন্দুকগুলো দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করে। তিনি বলেন, ‘আমারও মাঝেমধ্যে সিন্দুকের ভেতরে আসলে কী আছে, তা জানতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সে সুযোগ নেই।’

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার নবাব পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা খাজা আলীমুল্লাহ ১৮৩০ সালে বুড়িগঙ্গার তীরের কুঠিবাড়িটি কিনে সংস্কার করেছিলেন। তাঁর ছেলে আবদুল গনি আধুনিক নকশায় ভবনটি নতুন করে নির্মাণ করেন এবং নিজের ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নামে এর নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। ১৮৫৯ সালে শুরু হওয়া এই নির্মাণকাজ ১৮৭২ সালে শেষ হয়। ১৯৫২ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইনের আওতায় নবাব এস্টেট অধিগ্রহণের পর নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ প্রাসাদ ছেড়ে পরীবাগে চলে যান। ১৯৮৫ সালে সরকার এটি অধিগ্রহণ ও সংস্কার করে এবং ১৯৯২ সাল থেকে এটি জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

সিন্দুকগুলো কবে আহসান মঞ্জিলে আনা হয়েছিল, তার সঠিক তথ্য নেই। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নবাব পরিবারের ধনসম্পদের প্রাচুর্যের সময় টাকা ও মূল্যবান অলংকার সংরক্ষণের জন্য এগুলো লন্ডন থেকে আনা হয়েছিল। সিন্দুকে খোদাই করা তথ্য ও জাদুঘরের নিবন্ধন খাতা অনুযায়ী, সিন্দুকগুলোর প্রস্তুতকারক যুক্তরাজ্যের ‘চাব্‌স’ কোম্পানি, যা ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতার এজেন্ট ‘দ্য থমসন অ্যান্ড কোং’-এর মাধ্যমে এগুলো আনা হয়েছিল। শত বছরের বেশি পুরনো সিন্দুকগুলোতে এখনো মরিচা পড়েনি এবং এগুলোর লকিং সিস্টেম অত্যন্ত জটিল। সবচেয়ে বড় সিন্দুকটির উচ্চতা ২৫৪ সেন্টিমিটার ও চওড়া ১৪৮ সেন্টিমিটার, যাতে ৯৪টি লকার রয়েছে। অন্য চারটি সিন্দুকের মধ্যে তিনটির উচ্চতা ১৮০ সেন্টিমিটার ও চওড়া ৬৫ সেন্টিমিটার এবং বাকিটির উচ্চতা ১৮০ সেন্টিমিটার ও চওড়া ৯৯ সেন্টিমিটার।

১৯৮৭ সালের মে মাসে ভূমি মন্ত্রণালয় আহসান মঞ্জিলের মালামালের তালিকা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। ১৮ মে লোহার গরাদ কেটে তোশাখানা ও ক্রোকারিজ কক্ষ থেকে সিন্দুকগুলো উদ্ধার করা হয়। চাবি না পাওয়ায় গ্যাস কাটার দিয়ে একটি সিন্দুকের ৯৪টি লকারের একটি খোলা হয়েছিল, কিন্তু ভেতরে কিছুই পাওয়া যায়নি। এরপর ১৯৮৭ সালের ১৯ মে দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইনকিলাবে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ইনকিলাবের প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, নবাব হাবিবুল্লাহর মৃত্যুর পর ১৯৫৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর সিন্দুকটি খোলা হয়নি।

কৌতূহল বাড়তে থাকায় ১৯৮৭ সালের ২৪ মে বুয়েটের উপাচার্যের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২৫ ও ২৭ মে এবং ১ ও ২ জুন সিন্দুকটি খোলার কাজ করে। চাবি তৈরিতে ব্যর্থ হয়ে ৮৫ নম্বর লকারটি ড্রিল মেশিন দিয়ে ফুটো করা হয়, কিন্তু ভেতরে কিছুই পাওয়া যায়নি। পরে পেছন থেকে লকারগুলো খুলে দেখা যায় প্রতিটিই খালি। ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণের স্বার্থে সিন্দুকটি মেরামত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৮৭ সালের ২৮ নভেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় প্রতীকী মূল্যে (বড়টির দাম ২৭ হাজার টাকা, মাঝারিটির ১০ হাজার টাকা এবং বাকি তিনটির ৫০০ টাকা করে) সিন্দুকগুলো জাতীয় জাদুঘরকে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আরেকটি সিন্দুক খোলা হলেও তাতে কিছুই পাওয়া যায়নি। বাকি তিনটি আর খোলা হয়নি। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর ১৯১৫ সালের ১০ জুন খাজা হাবিবুল্লাহ নবাব হিসেবে অভিষিক্ত হন। হাবিবুল্লাহর সময় নবাব পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের একটি ভল্টও কখনো খোলা হয়নি, যেখানে ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহর বন্ধক রাখা ‘দরিয়া-ই-নূর’ হীরাসহ ১০৯টি রত্ন থাকার কথা রয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

আহসান মঞ্জিলের ৫ সিন্দুক: ৩টির রহস্য এখনো অমীমাংসিত

আপডেট সময় : ০৯:০০:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক বাসভবন আহসান মঞ্জিল বর্তমানে একটি জাদুঘর। এই জাদুঘরের ৯ নম্বর গ্যালারিতে নবাববাড়ির ব্যবহৃত পাঁচটি বিশালাকার লোহার সিন্দুক সংরক্ষিত রয়েছে। একসময় এগুলো নবাব পরিবারের কেন্দ্রীয় ভল্ট বা ব্যক্তিগত কোষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পাঁচটি সিন্দুকের মধ্যে তিনটি এখনো খোলা হয়নি, যা নিয়ে পুরান ঢাকায় নানা গল্প প্রচলিত আছে। আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের উপকিপার দিবাকর সিকদার জানান, তালাবদ্ধ সিন্দুকগুলো দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করে। তিনি বলেন, ‘আমারও মাঝেমধ্যে সিন্দুকের ভেতরে আসলে কী আছে, তা জানতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সে সুযোগ নেই।’

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার নবাব পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা খাজা আলীমুল্লাহ ১৮৩০ সালে বুড়িগঙ্গার তীরের কুঠিবাড়িটি কিনে সংস্কার করেছিলেন। তাঁর ছেলে আবদুল গনি আধুনিক নকশায় ভবনটি নতুন করে নির্মাণ করেন এবং নিজের ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নামে এর নামকরণ করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। ১৮৫৯ সালে শুরু হওয়া এই নির্মাণকাজ ১৮৭২ সালে শেষ হয়। ১৯৫২ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইনের আওতায় নবাব এস্টেট অধিগ্রহণের পর নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ প্রাসাদ ছেড়ে পরীবাগে চলে যান। ১৯৮৫ সালে সরকার এটি অধিগ্রহণ ও সংস্কার করে এবং ১৯৯২ সাল থেকে এটি জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

সিন্দুকগুলো কবে আহসান মঞ্জিলে আনা হয়েছিল, তার সঠিক তথ্য নেই। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নবাব পরিবারের ধনসম্পদের প্রাচুর্যের সময় টাকা ও মূল্যবান অলংকার সংরক্ষণের জন্য এগুলো লন্ডন থেকে আনা হয়েছিল। সিন্দুকে খোদাই করা তথ্য ও জাদুঘরের নিবন্ধন খাতা অনুযায়ী, সিন্দুকগুলোর প্রস্তুতকারক যুক্তরাজ্যের ‘চাব্‌স’ কোম্পানি, যা ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতার এজেন্ট ‘দ্য থমসন অ্যান্ড কোং’-এর মাধ্যমে এগুলো আনা হয়েছিল। শত বছরের বেশি পুরনো সিন্দুকগুলোতে এখনো মরিচা পড়েনি এবং এগুলোর লকিং সিস্টেম অত্যন্ত জটিল। সবচেয়ে বড় সিন্দুকটির উচ্চতা ২৫৪ সেন্টিমিটার ও চওড়া ১৪৮ সেন্টিমিটার, যাতে ৯৪টি লকার রয়েছে। অন্য চারটি সিন্দুকের মধ্যে তিনটির উচ্চতা ১৮০ সেন্টিমিটার ও চওড়া ৬৫ সেন্টিমিটার এবং বাকিটির উচ্চতা ১৮০ সেন্টিমিটার ও চওড়া ৯৯ সেন্টিমিটার।

১৯৮৭ সালের মে মাসে ভূমি মন্ত্রণালয় আহসান মঞ্জিলের মালামালের তালিকা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। ১৮ মে লোহার গরাদ কেটে তোশাখানা ও ক্রোকারিজ কক্ষ থেকে সিন্দুকগুলো উদ্ধার করা হয়। চাবি না পাওয়ায় গ্যাস কাটার দিয়ে একটি সিন্দুকের ৯৪টি লকারের একটি খোলা হয়েছিল, কিন্তু ভেতরে কিছুই পাওয়া যায়নি। এরপর ১৯৮৭ সালের ১৯ মে দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইনকিলাবে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ইনকিলাবের প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, নবাব হাবিবুল্লাহর মৃত্যুর পর ১৯৫৭ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর সিন্দুকটি খোলা হয়নি।

কৌতূহল বাড়তে থাকায় ১৯৮৭ সালের ২৪ মে বুয়েটের উপাচার্যের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২৫ ও ২৭ মে এবং ১ ও ২ জুন সিন্দুকটি খোলার কাজ করে। চাবি তৈরিতে ব্যর্থ হয়ে ৮৫ নম্বর লকারটি ড্রিল মেশিন দিয়ে ফুটো করা হয়, কিন্তু ভেতরে কিছুই পাওয়া যায়নি। পরে পেছন থেকে লকারগুলো খুলে দেখা যায় প্রতিটিই খালি। ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণের স্বার্থে সিন্দুকটি মেরামত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৮৭ সালের ২৮ নভেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় প্রতীকী মূল্যে (বড়টির দাম ২৭ হাজার টাকা, মাঝারিটির ১০ হাজার টাকা এবং বাকি তিনটির ৫০০ টাকা করে) সিন্দুকগুলো জাতীয় জাদুঘরকে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আরেকটি সিন্দুক খোলা হলেও তাতে কিছুই পাওয়া যায়নি। বাকি তিনটি আর খোলা হয়নি। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর ১৯১৫ সালের ১০ জুন খাজা হাবিবুল্লাহ নবাব হিসেবে অভিষিক্ত হন। হাবিবুল্লাহর সময় নবাব পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের একটি ভল্টও কখনো খোলা হয়নি, যেখানে ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহর বন্ধক রাখা ‘দরিয়া-ই-নূর’ হীরাসহ ১০৯টি রত্ন থাকার কথা রয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo