লোভ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে বিপন্ন পরিযায়ী পাখির অস্তিত্ব
- আপডেট সময় : ১১:১২:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে বাংলার হাওর, বিল, নদী ও উপকূলীয় কাদামাটিতে খাবারের সন্ধানে নামে দূরদেশি পরিযায়ী পাখিরা। হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আসা এসব পাখির ডানায় লেখা থাকে প্রকৃতির বিস্ময়কর অভিযাত্রার গল্প। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট, জলাভূমি ধ্বংস, দূষণ এবং অবৈধ শিকারের সম্মিলিত চাপে বিশ্বজুড়েই আজ এই পাখিদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
প্রতিবছর অক্টোবর ও মে মাসে পালিত হয় বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস। ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর দিবসটির দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্তর্জাতিক উদযাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘Every Bird Counts – Your Observations Matter!’ অর্থাৎ প্রতিটি পাখিই গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণ মানুষের পর্যবেক্ষণও বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।
বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত 'State of the World’s Birds' প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪৫ শতাংশ পরিযায়ী পাখির প্রজাতির সংখ্যা কমছে এবং প্রতি নয়টি প্রজাতির একটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘের পরিযায়ী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক কনভেনশন (সিএমএস) ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে জানায়, তাদের আওতাভুক্ত পরিযায়ী প্রাণীর ৪৪ শতাংশের জনসংখ্যা নিম্নমুখী। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, এই হার বেড়ে ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং ২৪ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাখির স্বাভাবিক জীবনচক্র ও ঋতুচক্রের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে শীতের সময়কাল, বৃষ্টিপাত এবং জলাশয়ের পানির স্তরে পরিবর্তন আসায় অনেক পাখি তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও বিশ্রামস্থল হারাচ্ছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে ২০০৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে ৬৯ প্রজাতির জলচর পাখির মধ্যে ৫৯ শতাংশ প্রজাতির সংখ্যা কমার প্রবণতা রয়েছে।
প্রকৃতির বিরূপ পরিস্থিতির পাশাপাশি মানুষের লোভও পাখিদের জন্য বড় হুমকি। মাংসের চাহিদা বা বিক্রির লোভে অসাধু ব্যক্তিরা ফাঁদ, জাল ও বিষটোপ প্রয়োগ করে পাখি শিকার করছে। এছাড়া জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পবর্জ্যের দূষণ পাখির খাদ্যভান্ডারকে সংকুচিত করছে।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য আইনি কাঠামো থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। শুধু শিকার বন্ধ করলেই হবে না, পাখির আবাসস্থল রক্ষা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। স্কুল, কলেজ ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিযায়ী পাখিরা কোনো একক দেশের সম্পদ নয়, বরং পৃথিবীর সম্মিলিত প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। তাদের হারিয়ে যাওয়া মানে প্রকৃতির গভীর অসুস্থতার সতর্কসংকেত।




























