ঢাকা ১১:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রিয়াদ বিমানবন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, বহু হতাহতের আশঙ্কা জার্মান পর্যটককে ম্যাকবুক উপহার দিলেন ঢাকার ব্যবসায়ী পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক ও প্রহরীর দায়িত্বে থাকবেন বিএনপির নেতাকর্মীরা: রিজভী শিবালয়ে ৩ লাখ টাকার চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও ধ্বংস অনিবার্য কারণে ঢাকা-রিয়াদ রুটের ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত জাফরপুর কালান থানা থেকে মুক্তি পেলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল হঠাৎ সংসদীয় দলের সভা ডেকেছেন তারেক রহমান দাবি আদায়ে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিলেন শিক্ষক নেতা আজিজী নিয়ামতপুরে শারদীয় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে মতবিনিময় সভা বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদন প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতার আশ্বাস

জின்னাহর ছবি বিতর্ক ও উপমহাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের দায়

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৮:২৩:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



বাংলাদেশে মুহাম্মদ আলী জின்னাহর ছবি টাঙানো নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা ও বিতর্ক কেবল একটি ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ ছবি কেন্দ্রিক আলোচনা মনে হলেও এর গভীরে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় এক শতক ধরে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ-ভারত তথা সমগ্র উপমহাদেশের জটিল রাজনৈতিক ইতিহাস। ফলে ছবিটি কে, কেন বা কোথায় টাঙালেন—সেই প্রশ্ন অতিক্রম করে এটি মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় জின்னাহর রাজনৈতিক পরিচয়, চরিত্র এবং তৎকালের বৃহৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে।

জின்னাহর প্রকৃত অবস্থান অনুধাবনে তিনি কেবলই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, নাকি ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক অধিকারের অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন—সেই মৌলিক প্রশ্নগুলো সামনে আসে। একই সঙ্গে ইকবালের চিন্তার প্রভাব, ব্রিটিশ শাসক ও কংগ্রেস নেতৃত্বের ভূমিকা এবং সর্বোপরি কেন অবিভক্ত বাংলা রক্ষা পেল না—এসব ঐতিহাসিক প্রশ্নের সুরাহা প্রয়োজন। আবেগ, স্লোগান কিংবা ব্যক্তিপূজার ঊর্ধ্বে উঠে সঠিক দলিল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমেই কেবল এই ইতিহাস নিরপেক্ষভাবে জানা সম্ভব। কারণ কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে একক কোনো ব্যক্তির জীবনীতে রূপান্তর করাই ইতিহাসের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভে মুহাম্মদ আলী জின்னাহ কিন্তু পৃথক দেশের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন সাংবিধানিক ধারার রাজনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক। জின்னাহ বিশ্বাস করতেন যে সাংবিধানিক সমঝোতা, রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ ও প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই ভারতীয়দের স্বশাসন অর্জিত হতে পারে। ১৯১৬ সালের ঐতিহাসিক লখনৌ চুক্তি ছিল এই ভাবনার এক বড় উদাহরণ। অখণ্ড ভারতে হিন্দু ও মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নের সুরাহায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে যে সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেখানে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ, ভারতের যৌথ সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভেতরেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল তার প্রারম্ভিক রাজনৈতিক কৌশল।

পরবর্তী সময়ে ১৯২৮ সালের নেহরু রিপোর্টের প্রেক্ষিতে মুসলিম রাজনীতির সাংবিধানিক দাবিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। সেই বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতিতে ১৯২৯ সালে জின்னাহ পেশ করেন তার বিখ্যাত ‘চৌদ্দ দফা’। এই দলিলে ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিরাপত্তার জন্য একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপিত হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—একটি ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামো গঠন, প্রদেশগুলোর হাতে অবশিষ্ট ক্ষমতা ন্যস্ত করা, কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করা এবং পাঞ্জাব ও বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান বহাল রাখা। একই সাথে সরকারি চাকরি ও স্থানীয় প্রশাসনে মুসলমানদের সুষম অংশগ্রহণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা ও পারিবারিক আইনের সুরক্ষার দাবিও এতে জোরের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।

জின்னাহকে কেবল 'দেশভাগের নেতা' হিসেবে আখ্যা দেওয়ার যে সরলীকরণ, তা মূলত এই দীর্ঘ সাংবিধানিক দর-কষাকষি ও বিবর্তনের পথটিকে উপেক্ষা করে। বহু বছরের সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘু রাজনীতির অভিজ্ঞতা, প্রতিনিধিত্বের টানাপোড়েন এবং কংগ্রেসের সঙ্গে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া মতপার্থক্যের পথ ধরেই তার রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। যদিও মুসলিম লীগ জின்னাহর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে ১৯৩৭ সালের পর তিনি উপলব্ধি করেন যে কেবল অভিজাত কেন্দ্রিক ও সাংবিধানিক চর্চার মাধ্যমে বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব সম্ভব নয়। এরপরই তিনি দলটিকে নতুন করে পুনর্গঠন করার উদ্যোগে নামেন। সর্বভারতীয় পর্যায়ে মুসলিম লীগকে সাধারণ মুসলিম সমাজের শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করার এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের দাবিকে এগিয়ে নেওয়ার মূল কারিগর হয়ে ওঠেন তিনি।

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮: ০৩আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮: ০৫

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

জின்னাহর ছবি বিতর্ক ও উপমহাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের দায়

আপডেট সময় : ০৮:২৩:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশে মুহাম্মদ আলী জின்னাহর ছবি টাঙানো নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা ও বিতর্ক কেবল একটি ছবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ ছবি কেন্দ্রিক আলোচনা মনে হলেও এর গভীরে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় এক শতক ধরে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ-ভারত তথা সমগ্র উপমহাদেশের জটিল রাজনৈতিক ইতিহাস। ফলে ছবিটি কে, কেন বা কোথায় টাঙালেন—সেই প্রশ্ন অতিক্রম করে এটি মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় জின்னাহর রাজনৈতিক পরিচয়, চরিত্র এবং তৎকালের বৃহৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে।

জின்னাহর প্রকৃত অবস্থান অনুধাবনে তিনি কেবলই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, নাকি ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক অধিকারের অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন—সেই মৌলিক প্রশ্নগুলো সামনে আসে। একই সঙ্গে ইকবালের চিন্তার প্রভাব, ব্রিটিশ শাসক ও কংগ্রেস নেতৃত্বের ভূমিকা এবং সর্বোপরি কেন অবিভক্ত বাংলা রক্ষা পেল না—এসব ঐতিহাসিক প্রশ্নের সুরাহা প্রয়োজন। আবেগ, স্লোগান কিংবা ব্যক্তিপূজার ঊর্ধ্বে উঠে সঠিক দলিল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমেই কেবল এই ইতিহাস নিরপেক্ষভাবে জানা সম্ভব। কারণ কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে একক কোনো ব্যক্তির জীবনীতে রূপান্তর করাই ইতিহাসের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভে মুহাম্মদ আলী জின்னাহ কিন্তু পৃথক দেশের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন সাংবিধানিক ধারার রাজনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক। জின்னাহ বিশ্বাস করতেন যে সাংবিধানিক সমঝোতা, রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ ও প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই ভারতীয়দের স্বশাসন অর্জিত হতে পারে। ১৯১৬ সালের ঐতিহাসিক লখনৌ চুক্তি ছিল এই ভাবনার এক বড় উদাহরণ। অখণ্ড ভারতে হিন্দু ও মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নের সুরাহায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে যে সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেখানে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ, ভারতের যৌথ সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভেতরেই মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল তার প্রারম্ভিক রাজনৈতিক কৌশল।

পরবর্তী সময়ে ১৯২৮ সালের নেহরু রিপোর্টের প্রেক্ষিতে মুসলিম রাজনীতির সাংবিধানিক দাবিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। সেই বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতিতে ১৯২৯ সালে জின்னাহ পেশ করেন তার বিখ্যাত ‘চৌদ্দ দফা’। এই দলিলে ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিরাপত্তার জন্য একগুচ্ছ সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপিত হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—একটি ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামো গঠন, প্রদেশগুলোর হাতে অবশিষ্ট ক্ষমতা ন্যস্ত করা, কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করা এবং পাঞ্জাব ও বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান বহাল রাখা। একই সাথে সরকারি চাকরি ও স্থানীয় প্রশাসনে মুসলমানদের সুষম অংশগ্রহণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা ও পারিবারিক আইনের সুরক্ষার দাবিও এতে জোরের সঙ্গে তুলে ধরা হয়।

জின்னাহকে কেবল 'দেশভাগের নেতা' হিসেবে আখ্যা দেওয়ার যে সরলীকরণ, তা মূলত এই দীর্ঘ সাংবিধানিক দর-কষাকষি ও বিবর্তনের পথটিকে উপেক্ষা করে। বহু বছরের সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘু রাজনীতির অভিজ্ঞতা, প্রতিনিধিত্বের টানাপোড়েন এবং কংগ্রেসের সঙ্গে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া মতপার্থক্যের পথ ধরেই তার রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। যদিও মুসলিম লীগ জின்னাহর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে ১৯৩৭ সালের পর তিনি উপলব্ধি করেন যে কেবল অভিজাত কেন্দ্রিক ও সাংবিধানিক চর্চার মাধ্যমে বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব সম্ভব নয়। এরপরই তিনি দলটিকে নতুন করে পুনর্গঠন করার উদ্যোগে নামেন। সর্বভারতীয় পর্যায়ে মুসলিম লীগকে সাধারণ মুসলিম সমাজের শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করার এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের দাবিকে এগিয়ে নেওয়ার মূল কারিগর হয়ে ওঠেন তিনি।

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮: ০৩আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮: ০৫

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh