দমন-পীড়নে নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন ইনু: ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়
- আপডেট সময় : ০২:৫৭:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে ঘোষিত রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ করা হয়েছে। ৫০০ পৃষ্ঠার এই রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাসানুল হক ইনু নিজে সরাসরি কাউকে হত্যা করেননি কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেননি। তবে তিনি তৎকালীন সহিংস দমন-পীড়নে সচেতনভাবে রাজনৈতিক বৈধতা ও নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন।
গত ৩০ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী রায়ে উল্লেখ করেছিলেন, জাসদ সভাপতির বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিটি প্রমাণিত অভিযোগে তাঁকে ১০ বছর করে সাজা দেওয়া হলেও সাজাগুলো যুগপৎ বা একসঙ্গে চলবে। ফলে তাঁকে সব মিলিয়ে ১০ বছর সাজা ভোগ করতে হবে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজা নির্ধারণ কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। এই সাজার মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক অপরাধের নিন্দা জানানো, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সমাজকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ভুক্তভোগীদের মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া।
রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৪-দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে হাসানুল হক ইনু অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক অবস্থানে ছিলেন। তিনি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নিতেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন। আন্দোলন দমনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈঠকগুলোতেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
এছাড়া আন্দোলন দমনে নেওয়া বিভিন্ন জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপকে ইনু বারবার সমর্থন করেছেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। তিনি আন্দোলনের সংগঠকদের চিহ্নিত করা, অংশগ্রহণকারীদের তালিকা তৈরি করা, বিক্ষোভের আগেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা এবং নেতৃত্ব ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। তাঁর এসব কর্মকাণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী বেআইনি অভিযানে শক্তি ও উৎসাহ জুগিয়েছে। গোপনে ধারণ করা টেলিফোন কথোপকথন, টেলিভিশন সাক্ষাৎকার ও সমসাময়িক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল তাঁর এই ভূমিকার প্রমাণ পেয়েছেন।
তবে ট্রাইব্যুনাল ইনুর সাজার ক্ষেত্রে কিছু প্রশমনকারী পরিস্থিতিও বিবেচনা করেছেন। রায়ে বলা হয়েছে, ইনু নিজে কোনো ভুক্তভোগীকে হত্যা করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং যেসব অভিযোগে প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে তাঁর ফৌজদারি দায় প্রমাণ করতে পারেনি, সেগুলো থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ও বার্ধক্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়, তাঁর দায় মূলত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ইচ্ছাকৃত অবদানের কারণে তৈরি হয়েছে, সরাসরি শারীরিক অপরাধী হিসেবে নয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানান, তাঁরা দু-তিন দিন আগে এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পেয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা আগামী এক মাসের মধ্যে আপিল করবেন। প্রসিকিউটর বলেন, রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে ইনুর উপস্থিতিতে কোনো সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ ঘটেনি। প্রসিকিউশনের দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্তটি যথার্থ ও আইনসংগত হয়নি এবং এই বিষয়ে তাঁরা সংক্ষুব্ধ।




























