সরকারি হাসপাতালে ট্রলি ও হুইলচেয়ার পেতেও দিতে হচ্ছে টাকা
- আপডেট সময় : ০১:১৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে গুরুতর অসুস্থ ও মুমূর্ষু রোগীদের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ট্রলি ও হুইলচেয়ার। রোগীদের এই জরুরি সেবাটি বিনামূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পেতে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। অসুস্থ রোগীদের চরম অসহায়ত্বকে পুঁজি করে হাসপাতালগুলোতে গড়ে উঠেছে ট্রলি, স্ট্রেচার ও হুইলচেয়ারের এক সিন্ডিকেট বাণিজ্য। গত মার্চ মাসে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ দেশের সব সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে হুইলচেয়ার ও ট্রলি সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছিল। একই সাথে দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধে সাত দফা নির্দেশনা জারি করা হয়, যার মধ্যে ছিল জরুরি বিভাগের কাছে দৃশ্যমান স্থানে বিনামূল্যে পাওয়ার লিখিত নির্দেশনা টাঙানো, নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম পরা সেবাকর্মী বা ওয়ার্ডবয়দের মাধ্যমে এগুলো বহন করা এবং বহিরাগতদের ট্রলি বা হুইলচেয়ার বাণিজ্য বন্ধ করা। তবে বাস্তবে এসব নির্দেশনার কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।
রাজধানীর তিনটি বড় সরকারি হাসপাতালে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, টাকা ছাড়া ট্রলি বা হুইলচেয়ার পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে মিনিট হিসেবে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। মাত্র ২০ মিনিটের জন্য রোগীদের ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। গত ২৪শে আগস্ট সোমবার বিকাল ৪টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরাতন ভবনের নিউরো সার্জারি বিভাগের সামনে নিজের মায়ের এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষার জন্য স্ট্রেচার খুঁজছিলেন বিল্লাল হোসেন। এক ব্যক্তি হুইলচেয়ার নিয়ে এসে ৫০০ টাকা দাবি করে। পরবর্তীতে ৩০০ টাকায় রফাদফা হয়। বিল্লাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এগুলো সরকারি সুবিধা হওয়া সত্ত্বেও কেন রোগীদের টাকা দিতে হবে?
একই হাসপাতালে গত ২০শে আগস্ট বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ থেকে নিজের অসুস্থ মাকে নিয়ে আসেন অন্তিম। জরুরি বিভাগে আনার পর ট্রলি বহনকারী কর্মচারীরা তাকে মেডিকেল অফিসারের রুমে নিয়ে যান। সেখান থেকে সার্জারি বিভাগে স্থানান্তরের জন্য প্রথমে ৩০০ টাকা দেওয়া হলেও ট্রলি কর্মচারী ৬০০ টাকা দাবি করেন এবং শেষ পর্যন্ত ৫০০ টাকা আদায় করেন। লিভারের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হওয়া আসলামের স্বজন ওয়াসিমও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ডে আসার পর ট্রলি চালক টাকা দাবি করায় ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। এখানে টাকা ছাড়া কোনো ট্রলি বা হুইলচেয়ার পাওয়া যায় না।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালেও চিত্র একই রকম। গত ২৩শে আগস্ট রোববার বিকাল ৩টায় জরুরি বিভাগে অসুস্থ মাকে নিয়ে আসা ইয়াকুব আলী ট্রলি খুঁজছিলেন। হাসপাতালের এক কর্মচারী ট্রলি নিয়ে এসে তাদের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের কাছে এবং সেখান থেকে মেডিসিন ওয়ার্ডে নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর ওই কর্মচারী ৫০০ টাকা দাবি করলে ইয়াকুব আলী ৩০০ টাকা দেন। ইয়াকুব বলেন, নিয়ম অনুযায়ী এটি ফ্রি সার্ভিস হলেও সামান্য টাকার জন্য তারা সেখানে ঝগড়া করতে পারেন না। এই হাসপাতালের আইসিইউর সামনে শাকিল হোসেন নামের আরেকজন জানান, তার মেয়ের কিডনি সমস্যার কারণে আইসিইউতে আছেন। সেখানে নার্সরা বিভিন্ন পরীক্ষার স্লিপ দিলেও টেস্ট করাতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। আইসিইউর রোগীদের জন্য আলাদা কোনো সুবিধা নেই এবং এখানেও টাকা ছাড়া ট্রলি বা হুইলচেয়ার মেলে না।
শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবার মিনিটের হিসেবে টাকা আদায় করা হয়। হাসপাতালের ৫২৯ নম্বর ওয়ার্ডের রোগীর স্বজন মো. সোহেল জানান, গত ১০ই আগস্ট তার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর নিচতলা থেকে ৫ তলায় ওঠার জন্য হুইলচেয়ার খুঁজতে যান। তখন এক স্টাফ ১০ মিনিটের ভাড়ার জন্য ৩০০ টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে স্ট্রেচার দেওয়া হবে না বলে জানান। এমনকি বেশি বাড়াবাড়ি করলে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়। পরে বাধ্য হয়ে ৩০০ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ওয়ার্ড বয়কে আরও ২০০ টাকা বকশিশ দিতে হয়। সোহেলের মতে, এই হাসপাতালে টাকা ছাড়া কিছুই নড়ে না। একই হাসপাতালের ২১৭ নম্বর ওয়ার্ডের রোগীর স্বজন হেলাল হোসেন জানান, তার মাকে জরুরি বিভাগ থেকে দ্বিতীয় তলার ওয়ার্ডে নেওয়ার জন্য ট্রলি চাইলে এক স্টাফ ট্রলি টানতে কষ্ট হওয়ার অজুহাতে ৬০০ টাকা দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত তাকে ৫০০ টাকা দিতে হয়, অথচ দেয়ালেই লেখা ছিল ‘ট্রলির জন্য কোনো টাকা লাগবে না’।
এইসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালের ভেতরে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আনুপাতিক হারে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অসাধু ব্যক্তিরা এই সুযোগটি নিচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তারা অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

























