বিতর্ক উড়িয়ে নেটফ্লিক্সে বিশ্বজুড়ে শীর্ষে কোরিয়ান সিরিজ ‘আওয়ার স্টিকি লাভ’
- আপডেট সময় : ০৫:২১:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে কোরিয়ান রোমান্টিক কমেডি সিরিজ ‘আওয়ার স্টিকি লাভ’। যদিও মুক্তির পরপরই এর প্রধান এক অভিনেত্রীকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল তুমুল বিতর্ক, এমনকি থমকে গিয়েছিল প্রচারণা কার্যক্রমও। তবে সব বিতর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহেই বিশ্বজুড়ে নেটফ্লিক্সের অ-ইংরেজি (নন-ইংলিশ) টিভি সিরিজের তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে এই সিরিজটি। একই সঙ্গে বাংলাদেশেও নেটফ্লিক্সের টপ চার্টে জায়গা করে নিয়েছে এই নাটকটি।
নেটফ্লিক্সের ১০ থেকে ১৬ আগস্টের সাপ্তাহিক হিসাব অনুযায়ী, ‘আওয়ার স্টিকি লাভ’ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৫ লাখ ভিউ এবং প্রায় ৮ কোটি ৮০ লাখ ঘণ্টা দেখার রেকর্ড গড়েছে। ৬৮টি দেশের নেটফ্লিক্স টপ ১০ তালিকায় জায়গা করে নেওয়া এই সিরিজটি দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ ২৬টি দেশে শীর্ষস্থান দখল করেছে। প্রথম সপ্তাহে পাঁচ নম্বরে থাকা সিরিজটি দ্বিতীয় সপ্তাহে চার ধাপ এগিয়ে সরাসরি এক নম্বরে চলে আসে। নেটফ্লিক্সের নিয়মে মোট দেখার ঘণ্টাকে সিরিজের মোট দৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করে ‘ভিউ’ হিসাব করা হয়।
১২ পর্বের এই সিরিজের মূল গল্প আবর্তিত হয়েছে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রসিকিউটর গো উন-সেকে ঘিরে। একটি বিপজ্জনক তদন্তের সময় গুরুতর হামলার শিকার হয়ে স্মৃতিশক্তি হারান তিনি। এরপর তাঁর জীবনে আসে জ্যাং তে-হা নামের এক সাবেক বক্সিং প্রতিভা, যে এখন ছোট একটি শহরের বক্সিং প্রশিক্ষক। তে-হা নিজেকে উন-সের প্রেমিক বলে দাবি করে। তবে এই সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরও বড় রহস্য। তে-হার রয়েছে অপরাধজগতের অতীত, আর উন-সে আসলে তদন্ত করছিলেন বড় একটি দুর্নীতি মামলার। দুজনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমান্তরালে জড়াতে থাকে অপরাধী চক্র, পুরোনো শত্রুতা ও গোপন সত্য।
সিরিজটির বৈশ্বিক সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে অভিনেতা জুং হে-ইনের তারকাখ্যাতি। ‘সামথিং ইন দ্য রেইন’, ‘ওয়ান স্প্রিং নাইট’, ‘স্নোড্রপ’, ‘ডি. পি.’ ও ‘লাভ নেক্সট ডোর’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজে অভিনয় করে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এই অভিনেতার নতুন কাজ নিয়ে দর্শকদের আগে থেকেই দারুণ আগ্রহ ছিল। এই সিরিজে তাঁর চরিত্রের দ্বৈততা—প্রেমিকার নিরাপত্তার জন্য নিজের অতীত গোপন রাখা এবং অ্যাকশন ও আবেগের চমৎকার মিশ্রণ দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। বাংলাদেশেও কোরিয়ান নাটকের দর্শকদের কাছে জুং হে-ইনের পরিচিতি ও এই সিরিজের রহস্যময় গল্প দারুণ সাড়া ফেলেছে।
তবে সিরিজটির এই যাত্রা মসৃণ ছিল না। গত ৭ আগস্ট সিরিজটি মুক্তির দিনই অভিনেত্রী হা ইয়ং দক্ষিণ কোরিয়ার একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন শো ‘প্রবলেম চাইল্ড ইন হাউস’-এ অংশ নেন। সেখানে তিনি তাঁর প্রপিতামহ চিকিৎসক আন সাং-হোর চিকিৎসার দীর্ঘ ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, তাঁর প্রপিতামহ জাপানে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়েছিলেন, হানইয়াংয়ে প্রথম দিকে পশ্চিমা ধাঁচের ক্লিনিক খোলেন এবং সম্রাট গো-জংয়ের চিকিৎসা করেছিলেন। এরপরই দর্শকেরা তাঁর প্রপিতামহের অতীত নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন।
ঐতিহাসিক নথি ঘেঁটে জানা যায়, ১৯১৬ সালে আন সাং-হো ‘দেজং চিনমকহোয়ে’ নামের একটি সংগঠনের কাউন্সিল সদস্য ছিলেন, যা কোরিয়া ও জাপানের একীভূতকরণের পক্ষে কাজ করেছিল। জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস দক্ষিণ কোরিয়ায় অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, বিশেষ করে ১৫ আগস্ট দেশটির স্বাধীনতা দিবস হওয়ায় এটি বড় বিতর্কের জন্ম দেয়।
বিতর্কের শুরুতে হা ইয়ংয়ের এজেন্সি বিস্টাস এন্টারটেইনমেন্ট অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন দাবি করলেও, পরে নথিপত্র যাচাই করে ১১ আগস্ট সত্যতা স্বীকার করে ক্ষমা চায়। হা ইয়ং নিজেও পরে হাতে লেখা চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করেন। এই বিতর্ককে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই ধরনের মত দেখা যায়। একদল মনে করেন, পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলার আগে তাঁর সচেতন হওয়া উচিত ছিল। অন্যদল মনে করেন, শতবর্ষ আগের পূর্বপুরুষের কাজের দায় বর্তমান প্রজন্মের ওপর চাপানো অনুচিত।
এই বিতর্কের জেরে হা ইয়ংয়ের নির্ধারিত বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার এবং ১৪ আগস্টের জন্য নির্ধারিত গোলটেবিল বৈঠক বাতিল করা হয়। তবে প্রচারণায় ধাক্কা লাগলেও দর্শকদের মাঝে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, বরং সিরিজটির বৈশ্বিক ভিউ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিতর্কটি শেষ পর্যন্ত নাটকটির বাড়তি প্রচারণায় ভূমিকা রেখেছে কি না তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন হলেও, এটি যে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়তি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তা স্পষ্ট।



























