জিপিএ-৫ পেয়েও পড়াশোনা বন্ধের শঙ্কায় শেরপুরের ফারজানা
- আপডেট সময় : ০৮:২৯:১৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে ফারজানা ইয়াসমিন। তবে এই অভাবনীয় সাফল্যের পরও তার চোখে ভবিষ্যতের কোনো রঙিন স্বপ্ন নেই। অভাবের কারণে যেকোনো সময় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কাটছে তার দিন।
ফারজানা উপজেলার উত্তর নাকশী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার বাড়ি শেরপুর সদর উপজেলার পলাশিয়া গ্রামে। নিজেদের কোনো জমিজমা না থাকায় প্রায় পাঁচ শতক বসতভিটার ওপর একটি টিনের ঘরে তাদের বসবাস। বৃদ্ধ বয়সেও ফারজানার বাবা মো. মতিন মিয়া রাজধানী ঢাকায় ভ্যান চালিয়ে কোনোমতে চার সদস্যের সংসার টেনে নিচ্ছেন। মা ফিরোজা বেগম গৃহিণী ছিলেন, তবে সংসারের ঋণের বোঝা বইতে না পেরে পরে তিনিও ঢাকায় গিয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ নেন। ফারজানা ও তার ছোট বোন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ফারহানাকে নিয়ে তাদের এই পরিবার।
অভাবের কারণে একসময় ফারজানার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এসএসসির নির্বাচনী পরীক্ষার আগে স্কুলের বকেয়া বেতন দিতে না পেরে সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি জানতে পেরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এগিয়ে আসেন এবং তাকে মাত্র ১ হাজার টাকা পরিশোধের মাধ্যমে পরীক্ষায় বসার সুযোগ করে দেন। এর আগে, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় সংসারের অভাব মেটাতে একটি সমিতির মাধ্যমে দরজির কাজ শেখে ফারজানা। এরপর পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়িতে বসে নারীদের পোশাক সেলাই করে নিজের ও ছোট বোনের পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা করত সে।
দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ফারজানার মা ঢাকায় চলে যাওয়ায় দুই বোন বাড়িতে একাই থাকত। ঘরের যাবতীয় কাজ, রান্নাবান্না ও বাজারঘাট শেষ করে তারা নিয়মিত স্কুলে যেত। চরম আর্থিক অনটনে মা-বাবা তাকে পড়াশোনা বন্ধ করে পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দিতে বললেও পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে ফারজানা তা করেনি। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও তার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। কলেজে ভর্তি, নতুন বই-খাতা, পোশাক ও যাতায়াত খরচ কীভাবে আসবে, তা নিয়ে সে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
ফারজানা জানায়, "আমি তো কোনো স্বপ্ন দেখি না। কারণ, যেকোনো সময় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাহলে শুধু শুধু স্বপ্ন দেখে লাভ কী?" সে আরও বলে, "অর্থের অভাবে মা-বাবার কাছে পড়াশোনার কোনো মূল্য নেই। তাঁরা মনে করেন, গার্মেন্টসে কাজ করলে সংসারে একটু ভালো থাকা যাবে। কিন্তু আমি পড়াশোনা করতে চাই। কীভাবে কলেজে ভর্তি হব, কাপড়চোপড়, কলেজে যাওয়া-আসার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে—এসব ভেবে দুশ্চিন্তায় দিন কাটে।"
উত্তর নাকশী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোফাজ্জল হোসেন জানান, ফারজানার বাবা ঢাকায় ভ্যান চালিয়ে খুব কষ্টে সংসার চালান। মেয়েটি অত্যন্ত মেধাবী ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হওয়ায় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে।
মুঠোফোনে ফারজানার বাবা মো. মতিন মিয়া বলেন, "মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য আমার নাই। সাহায্য-সহযোগিতা না পাইলে হয়তো বাধ্য হইয়া পড়াশোনা বন্ধ কইরা দিওয়ন লাগব। কিন্তু ফারজানার পড়াশোনার প্রতি খুবই আগ্রহ—অভাবের কারণে মেয়েডার স্বপ্নটা থাইমা যাক, তা তো বাবা হিসাবে আমি চাই না।"




























