ঢাকা ০২:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইয়েমেনের আল-মাশিক প্রাসাদে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: নিহত ২ পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে জবিতে গরু নিয়ে শিক্ষার্থীদের মিছিল মেসি পরবর্তী যুগে আর্জেন্টিনার পরবর্তী দুই প্রতিপক্ষ কারা সাতক্ষীরায় ফেসবুক লাইভ করে যুবককে পিটিয়ে হত্যা গাজীপুরে রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে মাদক কারবারিদের হামলা, আহত ২ নোবিপ্রবির পুরো ক্যাম্পাস সৌরবিদ্যুৎ চালুর পরিকল্পনা প্রতি তিন মাস পর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির তথ্য নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর মোহাম্মদপুরে দুই গ্রুপের গোলাগুলি, গুলিবিদ্ধ একজন কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ ও বিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান রাষ্ট্রপতির নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে প্রবাসী বাঙালির জমজমাট দুর্গোৎসব

৪৮ বছরে বিএনপি: রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক পরীক্ষার মুখোমুখি

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৫:০০:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

১লা সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি তার প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করল। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রমনা গ্রিনে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা সামনে আনেন। তবে এবারের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির জন্য আগের সবগুলোর চেয়ে আলাদা। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ২০৯টি আসন পেয়ে বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।

বিএনপি’র এই ৪৮ বছরের যাত্রাকে তিনটি পর্যায়ে দেখা যায়: প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র-রাজনীতির পুনর্গঠন, ক্ষমতা ও দলীয় প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং দীর্ঘ বিরোধী সংগ্রামের পর পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় জন্ম নেওয়া এই দলটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অটল থেকেছে। বিভিন্ন সময়ে চারবার সরকার পরিচালনা এবং দুই দফা প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা দলটি সামরিক হস্তক্ষেপ, নির্বাচন বর্জন, আন্দোলন, মামলা ও কারাবরণের মতো কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষত ২০০৭ সালের পর দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দলটির অবস্থান বর্তমান প্রত্যাবর্তনের মূল ভিত্তি তৈরি করেছে।

তবে রাজনৈতিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্রের দাবি করা আর ক্ষমতায় থেকে সেই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন পরীক্ষা। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি কেবল সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে, নাকি এমনভাবে পুনর্গঠন করা হবে যাতে কোনো সরকারই অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে না পারে? জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে ছয়টি কমিশন কাজ করেছে এবং ৮৪টি প্রস্তাবের ওপর রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ৬৮ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে, যেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬০.২৬ শতাংশ।

জনগণের এই রায়ের পর বিএনপি’র সামনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব হলো, সংস্কারগুলোকে দলীয় সুবিধার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে বাস্তবায়ন করা। সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও শাসনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সীমাবদ্ধতার সমন্বয়। একটি সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এলেও তা সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। বিচার বিভাগ, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বিরোধী দলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরীক্ষা। বিএনপি’র সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি শক্তিশালী সরকার তৈরি করবে, নাকি শক্তিশালী রাষ্ট্র? শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে হলে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা জরুরি।

একইসঙ্গে দলটির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নেতৃত্বের জবাবদিহি, তৃণমূলের মতামত ও প্রার্থী মনোনয়নের স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার স্বনির্ভরতার দর্শনকে বর্তমান বহুমুখী অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে পুনর্ব্যাখ্যা করে জনআস্থা অর্জনই বিএনপি সরকারের প্রধান রাজনৈতিক মূলধন হতে পারে। গণতন্ত্রে সর্বশক্তিমান সরকার বলে কিছু নেই; বরং সীমাবদ্ধ সরকার এবং সার্বভৌম নাগরিকরাই রাষ্ট্রের ভিত্তি। ৪৮ বছর পূর্তিতে বিএনপি’র রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরই এখন বাংলাদেশের পরবর্তী ৪৮ বছরের রাষ্ট্রচরিত্র অনেকাংশে নির্ভর করছে। দলটি ইতিহাসে কীভাবে স্মরণীয় হবে, তা তার অতীত যতটা নির্ধারণ করেছে, তার চেয়েও বেশি নির্ধারণ করবে ক্ষমতায় থেকে তারা গণতন্ত্রকে সবার জন্য কতটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

নিউজটি শেয়ার করুন

৪৮ বছরে বিএনপি: রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক পরীক্ষার মুখোমুখি

আপডেট সময় : ০৫:০০:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১লা সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি তার প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করল। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রমনা গ্রিনে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা সামনে আনেন। তবে এবারের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির জন্য আগের সবগুলোর চেয়ে আলাদা। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ২০৯টি আসন পেয়ে বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।

বিএনপি’র এই ৪৮ বছরের যাত্রাকে তিনটি পর্যায়ে দেখা যায়: প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্র-রাজনীতির পুনর্গঠন, ক্ষমতা ও দলীয় প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং দীর্ঘ বিরোধী সংগ্রামের পর পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় জন্ম নেওয়া এই দলটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অটল থেকেছে। বিভিন্ন সময়ে চারবার সরকার পরিচালনা এবং দুই দফা প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা দলটি সামরিক হস্তক্ষেপ, নির্বাচন বর্জন, আন্দোলন, মামলা ও কারাবরণের মতো কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষত ২০০৭ সালের পর দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দলটির অবস্থান বর্তমান প্রত্যাবর্তনের মূল ভিত্তি তৈরি করেছে।

তবে রাজনৈতিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্রের দাবি করা আর ক্ষমতায় থেকে সেই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন পরীক্ষা। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে মৌলিক প্রশ্ন উঠেছে—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি কেবল সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে, নাকি এমনভাবে পুনর্গঠন করা হবে যাতে কোনো সরকারই অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে না পারে? জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে ছয়টি কমিশন কাজ করেছে এবং ৮৪টি প্রস্তাবের ওপর রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ৬৮ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে, যেখানে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬০.২৬ শতাংশ।

জনগণের এই রায়ের পর বিএনপি’র সামনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব হলো, সংস্কারগুলোকে দলীয় সুবিধার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে বাস্তবায়ন করা। সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও শাসনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সীমাবদ্ধতার সমন্বয়। একটি সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এলেও তা সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। বিচার বিভাগ, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বিরোধী দলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরীক্ষা। বিএনপি’র সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তারা কি শক্তিশালী সরকার তৈরি করবে, নাকি শক্তিশালী রাষ্ট্র? শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে হলে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা এবং দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা জরুরি।

একইসঙ্গে দলটির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নেতৃত্বের জবাবদিহি, তৃণমূলের মতামত ও প্রার্থী মনোনয়নের স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার স্বনির্ভরতার দর্শনকে বর্তমান বহুমুখী অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে পুনর্ব্যাখ্যা করে জনআস্থা অর্জনই বিএনপি সরকারের প্রধান রাজনৈতিক মূলধন হতে পারে। গণতন্ত্রে সর্বশক্তিমান সরকার বলে কিছু নেই; বরং সীমাবদ্ধ সরকার এবং সার্বভৌম নাগরিকরাই রাষ্ট্রের ভিত্তি। ৪৮ বছর পূর্তিতে বিএনপি’র রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরই এখন বাংলাদেশের পরবর্তী ৪৮ বছরের রাষ্ট্রচরিত্র অনেকাংশে নির্ভর করছে। দলটি ইতিহাসে কীভাবে স্মরণীয় হবে, তা তার অতীত যতটা নির্ধারণ করেছে, তার চেয়েও বেশি নির্ধারণ করবে ক্ষমতায় থেকে তারা গণতন্ত্রকে সবার জন্য কতটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin