সাত মাসে নিখোঁজ প্রায় ১৬ হাজার শিশু, বাড়ছে উদ্বেগ
- আপডেট সময় : ১১:৩৫:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা মো. আবদুর রহিমের ১০ বছর বয়সী ছেলে মো. তানভীর আহমেদ গত ২০ আগস্ট মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। নিখোঁজের পর ১০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেলেও ছেলের সন্ধান না পেয়ে রূপনগর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তার বাবা। একইভাবে গত ৯ মে মিরপুরের দারুস সালাম এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় ৯ বছরের শিশু আলী হোসেন। বিকেলে খেলতে বের হওয়ার পর সে আর বাড়ি ফেরেনি। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় হন্যে হয়ে খুঁজেও সন্তানের সন্ধান না পেয়ে ১০ মে দারুস সালাম থানায় জিডি করেন তার বাবা।
কেবল তানভীর কিংবা আলী হোসেনই নয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে দেশে প্রায় ১৬ হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এই সাত মাসে মোট ১৫ হাজার ৯১৭ জন শিশু নিখোঁজ হওয়ায় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন থানায় জিডি করা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ৭৫ জনেরও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিখোঁজ হয়েছে জুন মাসে।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে নিখোঁজ হওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৬৮ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১ হাজার ৩৯২ জন, মার্চে ১ হাজার ৭০৮ জন, এপ্রিলে ২ হাজার ৬৬০ জন, মে মাসে ২ হাজার ৫৬ জন, জুন মাসে ৩ হাজার ১৬৩ জন এবং জুলাই মাসে ৩ হাজার ১১ জন। নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে কারো কারো সন্ধান মিললেও অধিকাংশেরই হদিস পাওয়া যায়নি। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও মানবাধিকার কর্মীরা।
নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে সিআইডি ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘মুন অ্যালার্ট’ নামে একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এতে টোল-ফ্রি হেল্পলাইন ১৩২১৯ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য জানানো যায়। পাশাপাশি মেটা (ফেসবুক)-এর সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে বিজ্ঞপ্তিও পাঠানো হয়। তবে বেসরকারি সংস্থা ‘মুন অ্যালার্ট’-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, গেল ছয় মাসে দেশে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ শিশু নিখোঁজ হয়েছে, অর্থাৎ তাদের হিসাবে গড়ে প্রতিদিন নিখোঁজ হচ্ছে প্রায় ১৯ জন শিশু।
রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে এই আতঙ্ক এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রান্তিক জনপদেও। চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ এবং পাবনা থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব এলাকাতেও শিশু নিখোঁজের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকা হওয়ায় সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহে পাচার চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক শিশু নিখোঁজের পেছনে মূলত পাচার চক্র, মুক্তিপণ আদায় এবং পারিবারিক বিরোধ কাজ করছে। নিখোঁজ শিশুদের একটি বড় অংশ সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, শিশু অপহরণের পেছনে মাদকের বিস্তার এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি বড় ভূমিকা রাখছে। পাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে শিশুরা নিখোঁজ হয়। অনেক সময় অঙ্গহানি বা ভিক্ষাবৃত্তির মতো অপরাধমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য তাদের অপহরণ করা হয়। এছাড়া বিকৃত মানসিকতা বা যৌন লালসার শিকার হয়েও অনেক শিশু অপহৃত হয়। নিঃসন্তান দম্পতি বা অপরাধী চক্র নিজের সন্তান হিসেবে বড় করার বা বিক্রির উদ্দেশ্যে নবজাতক বা ছোট শিশু চুরি করে। মুক্তিপণ আদায়, পূর্ব শত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বা ক্ষতি করতে তাদের সন্তানকে অপহরণ করা হয়ে থাকে। সব কিছু মিলিয়ে আমাদের সামাজিক পরিবেশের জন্যই বলি হচ্ছে শিশুরা।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, শিশুরা শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই তাদের টার্গেট করতে পারে। এ কারণেই শিশুদের নিশানা করার প্রবণতা বাড়ছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের দেশব্যাপী আরও শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন এবং পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত থাকা সাহানা হুদা বলেন, আগে আমরা মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকায় হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখতাম। কিন্তু এত সংখ্যক শিশু নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি খুবই এলামিং, সংখ্যাটা খুবই মারাত্মক। তিনি আরও বলেন, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত ও উদ্ধার অভিযান বিলম্বিত হয়। এতে অপরাধীরা সহজেই এলাকা ছাড়ার সুযোগ পেয়ে যায়। এ বিষয়ে প্রশাসনের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন বলেন, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি নিখোঁজ ডায়েরি ও মামলার তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। তবে হারানোর জিডির কতভাগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারণ অনেক শিশু নিজে নিজেই ফিরে আসে এবং এরপর পরিবার থেকে থানায় আর জানানো হয় না। যার ফলে এর সঠিক পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করা যায় না।
নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধার ও প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব সময়ই সমন্বিত উদ্যোগ ছিল। আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে মিটিং করি সেখানে সব বাহিনীর প্রতিনিধিরাই অংশগ্রহণ করেন এবং বড় কোনো সমস্যা মনে করলে আমরা সব বাহিনীর সমন্বয়েই সমাধান করে থাকি।


























