হিমালয়ে হিমবাহ গলন নিয়ে ৫ মাস আগেই ছিল ভয়াবহ সতর্কবার্তা
- আপডেট সময় : ০১:৫৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ৫৪৭ জনের মৃত্যু এবং হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার মাত্র পাঁচ মাস আগেই হিন্দুকুশ-হিমালয় (এইচকেএইচ) অঞ্চলের হিমবাহ গলনের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল দুটি গবেষণা প্রতিবেদন। অথচ সেই সতর্কবার্তা কেউ আমলে নেয়নি। হিমালয়ের পাদদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নেপাল সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তঃসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) মার্চ মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে। শতাব্দীর শুরু থেকে বরফ গলার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে হিমবাহগুলোর বরফের পুরুত্ব সর্বোচ্চ ২৭ মিটার পর্যন্ত কমে গেছে। এই অঞ্চলটি নেপাল, ভারত, ভুটান ও চীনসহ ১০টি দেশের প্রধান নদী ব্যবস্থার পানির উৎস এবং এশিয়ার ‘পানির টাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত। এই হিমবাহের ওপর ২০০ কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকা নির্ভরশীল।
আইসিআইএমওডি’র ‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬’ প্রতিবেদনে ৩৮টি হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহের মোট আয়তন ১২ শতাংশ এবং বরফের মজুত ৯ শতাংশ কমেছে। গবেষকদের মতে, এটি হিমালয়ের কিছু অংশের হিমবাহ অপরিবর্তনীয়ভাবে পিছিয়ে যাওয়ার ‘টিপিং পয়েন্ট’-এর কাছাকাছি পৌঁছানোর শক্তিশালী ইঙ্গিত। তবে গবেষণায় সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করা হয়েছে, কারণ কারাকোরাম, সিকিম ও ভুটানের মতো বিশাল হিমবাহসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলো পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের আওতায় নেই।
নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার কারণ অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীরা বরফশিলা ধসের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। গবেষকদের ধারণা, উচ্চ পার্বত্য এলাকা থেকে বিপুল বরফ ও শিলাখণ্ড ধসে লেন্দে খোলা নামক জলধারায় পড়ায় এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ভারতের ইন্দোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফারুক আজম জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তুষারের আচ্ছাদন কমে যাওয়ায় পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। এছাড়া ৪ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় তুষারের বদলে বৃষ্টিপাত এবং দ্রুত হিমবাহ সরে যাওয়ার পেছনে উষ্ণায়নের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, হিমবাহ গলার মাত্রা পুরো অঞ্চলে সমান নয়। পূর্ব হেংদুয়ান শান পর্বতমালায় গত ৩০ বছরে হিমবাহের আয়তন ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অন্যদিকে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় হিমবাহের সবচেয়ে বড় অংশ অবস্থিত হওয়ায় সেখানে ঝুঁকিও বেশি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহগুলোর ৭৮ শতাংশই উষ্ণায়নের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের কাছে নেপালের এই বিপর্যয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির একটি সতর্ক সংকেত।
নেপালে যে আকস্মিক বন্যায় ৫৩৮ জনের নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তদন্ত করছেন। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে এক্ষেত্রে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৪ হাজার মিটার বা তার বেশি উচ্চতায় যেখানে আগে তুষারপাত হওয়ার কথা, সেখানে বৃষ্টি হচ্ছে। ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান জিওলজির এক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, উচ্চ তাপমাত্রার কারণে এমনটা হতে পারে। যে উচ্চতায় একসময় তুষারপাত হতো, সেখানে বৃষ্টিপাত এবং দ্রুত হিমবাহ সরে যাওয়ার পেছনে উষ্ণায়নের ভূমিকা থাকতে পারে।
মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বরফের মজুত রয়েছে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে। আইসিআইএমওডি’র হিসাবে, এখানে ৬৩ হাজার ৭০০-এর বেশি হিমবাহ রয়েছে, যেগুলো প্রায় ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এসব হিমবাহ এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থার পানির উৎস। কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকা এই নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আইসিআইএমওডি’র মার্চের দুই প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহগুলোর অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতাভিত্তিক উষ্ণায়নের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।





























