ট্রাম্পকে কোণঠাসা করতে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল
- আপডেট সময় : ০২:৪০:০৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা বর্তমানে এক জটিল কূটনৈতিক মোড় নিয়েছে। তেহরান তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল এমনভাবে সাজাচ্ছে, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এই সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে থাকেন। ইরানের নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য হলো, ১৯৭৯-৮১ সালের মার্কিন দূতাবাস বন্দি সংকটের ফলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের যে রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছিল, ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঐতিহাসিক ও ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিশ্চিত করা। পরমাণু ইস্যুতে দুবার আলোচনা শুরুর পরও ট্রাম্পের নতুন করে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে হত্যা কিংবা প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ওপর প্রাণঘাতী হামলার প্রচেষ্টার ঘটনায় তেহরানে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। ফলে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পতন এখন তেহরানের নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের প্রধান আলোচনার বিষয়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনাকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ে সমঝোতার পর পরমাণু কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় পৌঁছাতে আরও দুই থেকে চার মাস সময় লাগবে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে পরমাণু আলোচনা শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসন তা বাতিল করে দিয়েছে। এর ফলে ইরান এবার নতুন করে বেশ কিছু কঠিন শর্ত আরোপ করেছে। তবে এই কৌশলের ঝুঁকি নিয়ে ইরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হবেন বা তার অভিশংসন প্রক্রিয়া সহজ হবে, যা তাকে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে। তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক নাসের হাদানের মতো বিশ্লেষকরা এই কৌশলের বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, ট্রাম্প দুর্বল হয়ে পড়লে বা নির্বাচনে হেরে গেলে তিনি ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর উৎসাহ হারাবেন। উপরন্তু, ট্রাম্পের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল আরও সহজে ইরানের ওপর হামলার সাহস পেতে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা কূটনৈতিক আলোচনার চেয়ে ভিন্ন রূপ নিচ্ছে। ট্রাম্প সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে এবং যুদ্ধ শেষ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমবে। তিনি দাবি করেন, ইরান ও অন্যান্য দেশ বড় ধরনের আক্রমণ এড়াতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চাইছে। তবে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করেছে, তারা কেবল ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জলপথসংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলছে। বর্তমানে এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক কর্তৃত্ব। ইরান তাদের ভূখণ্ডীয় জলসীমায় জাহাজ চলাচলের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ফি বা শুল্কারোপের সুযোগ রাখতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে এই প্রণালির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে দিতে নারাজ। তবে সামরিক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ সচল রাখতে মার্কিন প্রশাসনকে শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে এবং আংশিক হলেও ইরানি কর্তৃত্ব মেনে নিতে হতে পারে।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ যাতায়াতকারী এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। যদিও চীন ও ভারতের কিছু তেল শোধনাগার কোম্পানি ইরাকের বাসরা টার্মিনাল থেকে কম দামে খনিজ তেল কেনার চেষ্টা করছে, তবে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। এই সংকটের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাও বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডনক কোম্পানির অন্তত ১৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ এ পর্যন্ত হামলার শিকার হয়েছে, যার ফলে বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাতের এই নতুন সমীকরণের মধ্যে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে ইরান কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ইরানি আইন প্রণেতারা রিয়াদকে সতর্ক করে বলেছেন, কাগজের চুক্তি কখনও প্রকৃত নিরাপত্তা দিতে পারে না। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আঁচ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশে চার বছর বয়সী শিশুসহ অন্তত ১১ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে চালানো এই হামলায় সাতজন সৌদি, একজন ইয়েমেনি, দুজন মিশরীয় এবং একজন পাকিস্তানি নাগরিক আহত হন। সৌদি জোটের অভিযোগ, ইরানসমর্থিত হুথিরা বেসামরিক এলাকায় গোলার আঘাত হেনে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করেছে। সৌদি সামরিক সূত্র সতর্ক করেছে যে, হুথি এবং ইরানসমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো শিগগিরই সমন্বিতভাবে আরও বড় আকারের হামলা চালাতে পারে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হুথি কিংবা তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

























