জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে তাহাজ্জুদ পড়ে দোয়া করেছি: সাজ্জাদ নোমানী
- আপডেট সময় : ১০:৩১:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেছেন ভারতের বরেণ্য মানবাধিকারবাদী আলেম, সমাজসংস্কারক, লেখক ও শিক্ষাবিদ আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী। সফরকালে রাজধানী ঢাকার নিকুঞ্জের একটি রেস্ট হাউসে আমার দেশের পক্ষে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন আলী হাসান তৈয়ব। দীর্ঘ সেই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন, এ দেশের মানুষের ধর্মীয় আবেগ, আলেমদের ভূমিকা এবং একটি আদর্শ কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের নানা দিক।
ভারতের উত্তরপ্রদেশের লখনৌভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ‘রহমান ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাজ্জাদ নোমানী অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি বামসেফ ও ওয়ামান মেশরামের সঙ্গে যুক্ত থেকে ভারতের সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। মুসলিম মিরর তাকে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী মুসলিমের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নকশবন্দি তরিকার এই পণ্ডিত বিখ্যাত বুজুর্গ জুলফিকার আহমদ নকশবন্দির শিষ্য। নিজ শহরের দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা ও দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোরআন অধ্যয়নে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তার বাবা মনজুর নোমানী ছিলেন একজন প্রখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত, ধর্মতত্ত্ববিদ ও সাংবাদিক এবং দাদা সুফি মুহাম্মদ হুসাইন ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও জমিদার।
দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাংলাদেশ সফরে আসা সাজ্জাদ নোমানী এ দেশের মানুষের আতিথেয়তা ও ধর্মীয় আবেগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি জানান, প্রায় চার দশক আগে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় বয়ান করতে তিনি প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন। দীর্ঘ সময় পর এ দেশে এসে অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন দেখলেও মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা আগের মতোই অটুট পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলন নিয়ে অত্যন্ত আবেগঘন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এই প্রখ্যাত আলেম। তিনি জানান, ২৪-এর জুলাই আন্দোলনে যখন এ দেশের তরুণ-তরুণীরা বৈষম্যহীন দেশের লক্ষে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিচ্ছিল, তখন তিনি ভারত থেকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে এ দেশের সন্তানদের জন্য দোয়া করেছেন তিনি। বাংলাদেশের ‘জেন-জি’ প্রজন্মের এই সফল সংগ্রাম বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে ভারত ও নেপালে এক নতুন জাগরণ তৈরি করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি এই অর্জনকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
ইসলামের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আল্লামা নোমানী বলেন, ইসলাম হলো মানবজাতির সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য আল্লাহর পাঠানো একটি ঐশী কর্মসূচি। অথচ বর্তমান যুগে অনেক ক্ষেত্রে ইসলামকে কেবল অনাহার, ত্যাগ ও কষ্টের ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা সাধারণ মানুষকে দ্বিধান্বিত করে। তিনি আলেমদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, তারা যেন মানুষকে হালাল উপায়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে বিত্তবান হওয়ার এবং সেই সম্পদ দিয়ে এতিম, বিধবা ও দরিদ্রদের সাহায্য করার শিক্ষা দেন।
বাংলাদেশে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে আলেমদের অনুপস্থিতির বিষয়টিকে উলামায়ে কিরামেরই অসফলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন সাজ্জাদ নোমানী। তিনি মনে করেন, সাধারণ জনগণ ও আধুনিক শিক্ষিত তরুণ সমাজকে কাছে টানতে না পারার দায় আলেমদেরও রয়েছে। তরুণদের অনভিপ্রেত আচরণকে একটু সহ্য করে পরম মমতায় বুকে টেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো তরুণ যদি হাফপ্যান্ট পরে মসজিদে আসে, তাকেও যেন তিরস্কার না করে স্বাগত জানানো হয়। স্কুল-কলেজে কুইজ ও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদের ইসলামের সৌন্দর্যের দিকে আকৃষ্ট করার তাগিদ দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নাস্তিক্যবাদ বা চিন্তাগত বিভ্রান্তি (ফিকরি ইরতিদাদ) মোকাবিলার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাই এমনভাবে সাজানো যা সংশয় তৈরি করে। তাই তরুণদের রাসুলের (সা.) একাধিক বিয়ে, জিহাদ বা পর্দা নিয়ে যে যৌক্তিক প্রশ্ন ও সংশয় রয়েছে, তা দূর করতে যৌক্তিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ জন্য মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক বন্ধন মজবুত করা জরুরি।
সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে ‘খেদমতে খালক’ বা মানবসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন সাজ্জাদ নোমানী। সামষ্টিক উদ্যোগের মাধ্যমে দরিদ্রদের চিকিৎসা, শিক্ষা এবং এতিম ও বিধবাদের পুনর্বাসনে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। এই সেবামূলক কাজ যেন কোনো ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য দরিদ্র অমুসলিমদেরও সাহায্য করার ওপর জোর দেন তিনি।
রাষ্ট্রের শাসক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি এবং হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহর (রহ.) পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দেন সাজ্জাদ নোমানী। তিনি বলেন, শাসকদের প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিরোধী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন না করে তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী হতে হবে। মুখোমুখি অবস্থান নিলে রাষ্ট্রশক্তি দাওয়াতের কাজের বিপরীত দিকে ব্যবহৃত হতে পারে, যা দ্বীনের ক্ষতি করবে। এ ছাড়া, কোনো নির্দিষ্ট 'মাসলাক' বা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে খাঁটি ও মৌলিক ইসলামের দিকে মানুষকে ডাকার আহ্বান জানান তিনি।
সাক্ষাৎকারে আলেমদের প্রতি নিজের একটি আক্ষেপের কথাও প্রকাশ করেন আল্লামা নোমানী। তিনি অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এই সফরে তার জন্য নারীদের কোনো বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়নি। তিনি জানান, ভারতে কোনো সফরে যাওয়ার আগে তিনি শর্ত দেন যেন নারীদের জন্য বিশেষ করে তরুণীদের জন্য পৃথক প্রোগ্রাম রাখা হয়। সমাজের অর্ধেক অংশকে দ্বীন থেকে দূরে রেখে একটি আদেশ সমাজ বা রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভারতে নিজের দ্বীনি মেহনতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনি চেতনা জাগ্রত করার জন্য তিনি দেশজুড়ে সফর করেন। বর্তমানে মানুষের মধ্যে ইসলামের প্রতি এক প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। তিনি যে এলাকাতেই যান, সেখানকার আয়োজকদের সব ব্যবস্থাপনা ফেইল করে যায়। কারণ, তারা হয়তো আশা করে ১০ হাজার মানুষ আসবে, আর সেখানে চলে আসে ৫০ হাজার মানুষ! এই বিপুল সমাগম সামাল দিতে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হয়। তিনি মনে করেন, ভারতে মুসলিমদের ওপর যত বেশি জুলুম-নির্যাতন বাড়ছে, মানুষ তত বেশি ইসলামের দিকে ফিরে আসছে, যা আল্লাহর এক বিশেষ হিকমত।



























