ঢাকা ০১:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে সরকার কাজ করছে: মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুজবে বিশ্বাস নেই মির্জা ফখরুলের নাইজেরিয়ায় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ল এনুগু এয়ার, রক্ষা পেলেন ৬৮ যাত্রী কৈশোর স্বাস্থ্যসেবায় ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেলের সুপারিশ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে নতুন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাজারে পেঁয়াজ, ডিম ও সবজির দাম আরও বেড়েছে ২৪ জুলাই ২০২৪: কারফিউ ও চিরুনি অভিযানে সারা দেশে ব্যাপক গ্রেপ্তার ৮০টিরও বেশি দেশে নতুন শুল্ক আরোপ করল মার্কিন প্রশাসন নৌযান শুমারি ২০২৬: ডাটাবেজ তৈরিতে রংপুরে অবহিতকরণ সেমিনার দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমালো বাজুস, নতুন দর কার্যকর

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের রূপান্তর: বাংলাদেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৭:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শুধু বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মস্থল নয়, বরং দেশের অর্থনীতির অন্যতম নির্ভরতার ভিত্তি। এসব দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় প্রবৃদ্ধি পর্যন্ত এক অদৃশ্য চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যে মধ্যপ্রাচ্য লাখো বাংলাদেশির স্বপ্ন ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস ছিল, সেই ভূখণ্ড এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ধোঁয়া, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা তেলের বাজারের ওঠানামার চেয়েও বড় পরিবর্তন ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ভেতরে, যেখানে অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ শ্রমের চাহিদা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও রোবোটিকস মানুষের হাতে করা বহু কাজের বিকল্প হয়ে উঠছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে জাতীয়করণ নীতির মাধ্যমে নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী এক দশকে এসব দেশে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদার চরিত্রই বদলে যেতে পারে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়টি হলো, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার যদি বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য আগের মতো উন্মুক্ত না থাকে, তাহলে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সনির্ভর উন্নয়নের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মৌলিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আজ আর কাল্পনিক নয়; বরং ক্রমেই নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। এটি শুধু কতজন বাংলাদেশি বিদেশে যাবেন, তা নয়; বরং আগামী দশকে আদৌ আমাদের শ্রম রপ্তানির প্রচলিত মডেলটি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে।

বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রতিবছর ১০ লাখের কাছাকাছি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে গেছেন। তাঁদের বড় অংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলো, যেখান থেকে মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি আসে। কিন্তু এই বিপুল জনশক্তির বেশির ভাগই স্বল্প দক্ষ বা অর্ধদক্ষ শ্রমিক। এই মডেল গত তিন দশকে সফল ছিল, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্মাণ, অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক স্বল্প দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সৌদি আরব ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, পর্যটন, ডিজিটাল সেবা ও উন্নত শিল্পের দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে চলছে ‘সৌদীকরণ’, কাতারে চলছে ‘কাতারীকরণ’, সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলছে ‘আমিরাতকরণ’, কুয়েতে চলছে ‘কুয়েতীকরণ’ আর ওমানে চলছে ‘ওমানীকরণ’ তথা নিজেদের নাগরিকদের কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি।

এ প্রবণতা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশেও দেখা যাচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজ দেশের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই এসব জাতীয়করণ নীতির মূল উদ্দেশ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অটোমেশন, স্মার্ট লজিস্টিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, যা পুনরাবৃত্তিমূলক স্বল্প দক্ষ কাজের চাহিদা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণনির্ভর বৃহৎ প্রকল্পগুলোর গতি ধীরে ধীরে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছানোয় মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক নির্মাণশ্রমিকের চাহিদাও আগের মতো নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এখন পরিমাণের চেয়ে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিশেষায়িত পেশাগত যোগ্যতার মূল্য দ্রুত বাড়ছে, যা বাংলাদেশসহ প্রচলিত শ্রম রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ডিজিটাল রূপান্তর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের চাহিদা বদলে দিচ্ছে। তারা দেখিয়েছে, দু–এক বছরের মধ্যে আরব অঞ্চলে প্রায় ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ চাকরি (প্রায় ৮০ লাখ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে আর প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি (প্রায় ১২ লাখ) স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বিলুপ্ত বা প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে রয়েছে। সংস্থাটির ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আরব অঞ্চলে মোট কর্মঘণ্টা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই হ্রাস ১০ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার ধাক্কারও চেয়ে বড়। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতায় কর্মসংস্থান সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করবেন অভিবাসী শ্রমিকেরা।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো স্বল্প দক্ষ বা অর্ধদক্ষ কাজে নিয়োজিত। ফলে তাঁরা সাধারণত কম মজুরি পান, সহজে প্রতিস্থাপিত হন এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনের ধাক্কাও সবার আগে তাঁদের ওপর আসে। অন্যদিকে একই সময়ে আরব বিশ্বজুড়েই চাহিদা বাড়ছে শিল্প অটোমেশন প্রযুক্তিবিদ, উন্নত ওয়েল্ডার, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রযুক্তিবিদ, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিশেষজ্ঞ, লজিস্টিকস অপারেটর, তথ্যপ্রযুক্তি-দক্ষ কর্মী এবং ডিজিটাল রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশ কি সেই মানুষগুলো তৈরি করছে? সৎ উত্তরটি সম্ভবত—এখনো নয়। নির্মাণশ্রমিক, সাধারণ সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহস্থালি কর্মী বা নিম্নস্তরের সেবা খাতের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান অভিবাসন পথ তৈরি করেছে। এসব কর্মীর শ্রম ছাড়া অনেক অর্থনীতি চলতে পারে না, কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বাস্তবতা হলো সব কাজের মূল্য সমানভাবে বাড়বে না।

ধরা যাক, আগামী ১০ বছরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ওমানে স্বল্প দক্ষ বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেল। তখন কী হবে? অনেকের ধারণা, শুধু রেমিট্যান্স কমবে। বাস্তবে সংকট শুরু হবে তারও আগে। প্রথমে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ কমবে। এরপর মজুরি কমবে। নিয়োগকর্তারা একই বেতনে আরও দক্ষ কর্মী নিয়োগ করবেন। বাংলাদেশের স্বল্প দক্ষ শ্রমিক সবচেয়ে আগে বাদ পড়বেন। হাজার হাজার প্রত্যাবর্তী শ্রমিককে দেশি শ্রমবাজারে ফিরতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমবে। গ্রামীণ ভোগ ব্যয় কমবে। যে পরিবারগুলো প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপর চাপ বাড়বে। স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, অর্থাৎ এটি শুধু শ্রমবাজারের সংকট নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের জন্য একটি কাঠামোগত ঝুঁকি।

বাংলাদেশের মতোই ফিলিপাইন, ভারত, ভিয়েতনাম, নেপাল বা পাকিস্তান একই বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করে, কিন্তু তাদের কৌশল ভিন্ন। ফিলিপাইন দীর্ঘদিন ধরে নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মেরিটাইম পেশাজীবী এবং বিভিন্ন সেবা খাতের দক্ষ কর্মী তৈরি করে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে অবস্থান শক্তিশালী করেছে। ভারত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। ভিয়েতনাম উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। নেপাল সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা এখন দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পাকিস্তান বাজারভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ননীতিতে জোর দিয়ে কোন খাতে উপসাগরীয় দেশগুলোয় ভবিষ্যতে চাহিদা থাকবে সে অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সনদায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তান প্রবাসী কর্মীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আধুনিক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জব-ম্যাচিং, ডিজিটাল সার্টিফিকেট যাচাই, অনলাইন প্রি-ডিপার্চার প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল রিক্রুটমেন্ট প্ল্যাটফর্ম চালুর রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভিবাসননীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। কীভাবে আরও বেশি মানুষ বিদেশে পাঠানো যায় কিংবা রেমিট্যান্স কত বাড়ল—এই সংখ্যাতাত্ত্বিক মানসিকতা বাদ দিতে হবে। চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে নিতে হবে, কীভাবে এমন দক্ষ কর্মী তৈরি করা যায়, যাঁদের জন্য বিদেশি নিয়োগকর্তারা প্রতিযোগিতা করবেন। এ পরিবর্তনের জন্য অন্তত পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে: বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি সনদ ও দক্ষতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা, ভাষা শিক্ষা ও ডিজিটাল দক্ষতাকে অভিবাসন প্রস্তুতির অংশ করা, বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা এবং অভিবাসনকে শুধু প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে শিক্ষা, শিল্প, পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমন্বিত কৌশল হিসেবে দেখা। সবশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী আর ভারত, নেপাল বা পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হচ্ছে প্রযুক্তি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব দক্ষ কর্মীবাহিনী। চার দশক ধরে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যেকে সস্তা শ্রম দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য আর সস্তা শ্রম কিনবে না, কিনবে দক্ষতা। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে শুধু সংখ্যায় বেশি কর্মী বিদেশ পাঠায় না; বরং অত্যাধুনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরি করে পাঠায়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের রূপান্তর: বাংলাদেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা

আপডেট সময় : ১০:৪৭:০৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
print news

কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শুধু বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মস্থল নয়, বরং দেশের অর্থনীতির অন্যতম নির্ভরতার ভিত্তি। এসব দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় প্রবৃদ্ধি পর্যন্ত এক অদৃশ্য চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যে মধ্যপ্রাচ্য লাখো বাংলাদেশির স্বপ্ন ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস ছিল, সেই ভূখণ্ড এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ধোঁয়া, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা তেলের বাজারের ওঠানামার চেয়েও বড় পরিবর্তন ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ভেতরে, যেখানে অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ শ্রমের চাহিদা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও রোবোটিকস মানুষের হাতে করা বহু কাজের বিকল্প হয়ে উঠছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে জাতীয়করণ নীতির মাধ্যমে নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী এক দশকে এসব দেশে বিদেশি শ্রমিকের চাহিদার চরিত্রই বদলে যেতে পারে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়টি হলো, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার যদি বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য আগের মতো উন্মুক্ত না থাকে, তাহলে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সনির্ভর উন্নয়নের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মৌলিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আজ আর কাল্পনিক নয়; বরং ক্রমেই নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। এটি শুধু কতজন বাংলাদেশি বিদেশে যাবেন, তা নয়; বরং আগামী দশকে আদৌ আমাদের শ্রম রপ্তানির প্রচলিত মডেলটি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে।

বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রতিবছর ১০ লাখের কাছাকাছি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে গেছেন। তাঁদের বড় অংশের গন্তব্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলো, যেখান থেকে মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি আসে। কিন্তু এই বিপুল জনশক্তির বেশির ভাগই স্বল্প দক্ষ বা অর্ধদক্ষ শ্রমিক। এই মডেল গত তিন দশকে সফল ছিল, কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্মাণ, অবকাঠামো ও সেবা খাতে বিপুলসংখ্যক স্বল্প দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সৌদি আরব ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, পর্যটন, ডিজিটাল সেবা ও উন্নত শিল্পের দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে চলছে ‘সৌদীকরণ’, কাতারে চলছে ‘কাতারীকরণ’, সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলছে ‘আমিরাতকরণ’, কুয়েতে চলছে ‘কুয়েতীকরণ’ আর ওমানে চলছে ‘ওমানীকরণ’ তথা নিজেদের নাগরিকদের কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি।

এ প্রবণতা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশেও দেখা যাচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ সরকারি ও বেসরকারি খাতে নিজ দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজ দেশের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই এসব জাতীয়করণ নীতির মূল উদ্দেশ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অটোমেশন, স্মার্ট লজিস্টিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, যা পুনরাবৃত্তিমূলক স্বল্প দক্ষ কাজের চাহিদা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণনির্ভর বৃহৎ প্রকল্পগুলোর গতি ধীরে ধীরে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছানোয় মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক নির্মাণশ্রমিকের চাহিদাও আগের মতো নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এখন পরিমাণের চেয়ে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিশেষায়িত পেশাগত যোগ্যতার মূল্য দ্রুত বাড়ছে, যা বাংলাদেশসহ প্রচলিত শ্রম রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৫ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ডিজিটাল রূপান্তর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের চাহিদা বদলে দিচ্ছে। তারা দেখিয়েছে, দু–এক বছরের মধ্যে আরব অঞ্চলে প্রায় ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ চাকরি (প্রায় ৮০ লাখ) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে আর প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ চাকরি (প্রায় ১২ লাখ) স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বিলুপ্ত বা প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে রয়েছে। সংস্থাটির ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আরব অঞ্চলে মোট কর্মঘণ্টা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই হ্রাস ১০ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার ধাক্কারও চেয়ে বড়। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতায় কর্মসংস্থান সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করবেন অভিবাসী শ্রমিকেরা।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো স্বল্প দক্ষ বা অর্ধদক্ষ কাজে নিয়োজিত। ফলে তাঁরা সাধারণত কম মজুরি পান, সহজে প্রতিস্থাপিত হন এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনের ধাক্কাও সবার আগে তাঁদের ওপর আসে। অন্যদিকে একই সময়ে আরব বিশ্বজুড়েই চাহিদা বাড়ছে শিল্প অটোমেশন প্রযুক্তিবিদ, উন্নত ওয়েল্ডার, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক প্রযুক্তিবিদ, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিশেষজ্ঞ, লজিস্টিকস অপারেটর, তথ্যপ্রযুক্তি-দক্ষ কর্মী এবং ডিজিটাল রক্ষণাবেক্ষণ বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশ কি সেই মানুষগুলো তৈরি করছে? সৎ উত্তরটি সম্ভবত—এখনো নয়। নির্মাণশ্রমিক, সাধারণ সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহস্থালি কর্মী বা নিম্নস্তরের সেবা খাতের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধান অভিবাসন পথ তৈরি করেছে। এসব কর্মীর শ্রম ছাড়া অনেক অর্থনীতি চলতে পারে না, কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বাস্তবতা হলো সব কাজের মূল্য সমানভাবে বাড়বে না।

ধরা যাক, আগামী ১০ বছরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ওমানে স্বল্প দক্ষ বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেল। তখন কী হবে? অনেকের ধারণা, শুধু রেমিট্যান্স কমবে। বাস্তবে সংকট শুরু হবে তারও আগে। প্রথমে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ কমবে। এরপর মজুরি কমবে। নিয়োগকর্তারা একই বেতনে আরও দক্ষ কর্মী নিয়োগ করবেন। বাংলাদেশের স্বল্প দক্ষ শ্রমিক সবচেয়ে আগে বাদ পড়বেন। হাজার হাজার প্রত্যাবর্তী শ্রমিককে দেশি শ্রমবাজারে ফিরতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমবে। গ্রামীণ ভোগ ব্যয় কমবে। যে পরিবারগুলো প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপর চাপ বাড়বে। স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, অর্থাৎ এটি শুধু শ্রমবাজারের সংকট নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের জন্য একটি কাঠামোগত ঝুঁকি।

বাংলাদেশের মতোই ফিলিপাইন, ভারত, ভিয়েতনাম, নেপাল বা পাকিস্তান একই বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করে, কিন্তু তাদের কৌশল ভিন্ন। ফিলিপাইন দীর্ঘদিন ধরে নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মেরিটাইম পেশাজীবী এবং বিভিন্ন সেবা খাতের দক্ষ কর্মী তৈরি করে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে অবস্থান শক্তিশালী করেছে। ভারত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। ভিয়েতনাম উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। নেপাল সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা এখন দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পাকিস্তান বাজারভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ননীতিতে জোর দিয়ে কোন খাতে উপসাগরীয় দেশগুলোয় ভবিষ্যতে চাহিদা থাকবে সে অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সনদায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তান প্রবাসী কর্মীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আধুনিক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জব-ম্যাচিং, ডিজিটাল সার্টিফিকেট যাচাই, অনলাইন প্রি-ডিপার্চার প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল রিক্রুটমেন্ট প্ল্যাটফর্ম চালুর রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভিবাসননীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। কীভাবে আরও বেশি মানুষ বিদেশে পাঠানো যায় কিংবা রেমিট্যান্স কত বাড়ল—এই সংখ্যাতাত্ত্বিক মানসিকতা বাদ দিতে হবে। চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে নিতে হবে, কীভাবে এমন দক্ষ কর্মী তৈরি করা যায়, যাঁদের জন্য বিদেশি নিয়োগকর্তারা প্রতিযোগিতা করবেন। এ পরিবর্তনের জন্য অন্তত পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে: বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি সনদ ও দক্ষতার স্বীকৃতি নিশ্চিত করা, ভাষা শিক্ষা ও ডিজিটাল দক্ষতাকে অভিবাসন প্রস্তুতির অংশ করা, বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা এবং অভিবাসনকে শুধু প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে শিক্ষা, শিল্প, পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমন্বিত কৌশল হিসেবে দেখা। সবশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী আর ভারত, নেপাল বা পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী হচ্ছে প্রযুক্তি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব দক্ষ কর্মীবাহিনী। চার দশক ধরে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যেকে সস্তা শ্রম দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য আর সস্তা শ্রম কিনবে না, কিনবে দক্ষতা। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে শুধু সংখ্যায় বেশি কর্মী বিদেশ পাঠায় না; বরং অত্যাধুনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরি করে পাঠায়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo