হুতিদের বাব আল-মান্দেব অবরোধের হুমকি: কাঁপছে বিশ্ব তেলের বাজার

- আপডেট সময় : ০৯:২৭:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্ব তেলের বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধের হুমকি। হরমুজ প্রণালির পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধের এই হুমকি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হুতিরা যদি সত্যিই এই অবরোধ কার্যকর করতে পারে, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে এবং সংঘাতের একটি নতুন ফ্রন্ট তৈরি হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করতে হতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর চলতি মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২২ জুলাই (বুধবার) তেলের দাম সাময়িকভাবে ৯৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা জুনের শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ। মাত্র ১৪ মাইল চওড়া বাব আল-মান্দেব প্রণালিটি হরমুজ প্রণালির চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ সংকীর্ণ হলেও এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রপথ। তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, গত এক মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬২ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি আরব তাদের বিশাল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাচ্ছে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট জানান, সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই বিকল্প পথে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে হুতিদের হুমকির কারণে এই বিকল্প পথটিও এখন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। হেলিমা ক্রফটের মতে, এই পথটিও যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে এমন এক সংকট তৈরি হবে যা থেকে বের হওয়ার কোনো পথ থাকবে না। বাজার থেকে প্রতিদিন ৪০ লাখ ব্যারেল তেল হারিয়ে যাওয়ার প্রভাব হবে অত্যন্ত মারাত্মক।
পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং মনে করেন, বাব আল-মান্দেব পুরোপুরি অবরুদ্ধ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আরও ৫ থেকে ১০ ডলার বেড়ে সহজেই ১০০ ডলারের গণ্ডি পার হবে। লোহিত সাগর বন্ধ হলে জাহাজগুলোর একমাত্র বিকল্প থাকবে সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে যাওয়া, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সৌদি তেল পাঠানোর জন্য উপযুক্ত নয়। লিপো ওয়ান অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপোভের তথ্যমতে, প্রতিদিন ইয়ানবু বন্দর থেকে ২৫ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেল সৌদি তেল বাব আল-মান্দেব হয়ে রপ্তানি করা হয়। ফলে এই সরবরাহ ব্যাহত হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যারা নিজস্ব তেল উৎপাদনে পিছিয়ে, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শুধু অপরিশোধিত তেলই নয়, ইউরোপের ডিজেল সরবরাহও হুমকির মুখে পড়েছে। কেপলারের তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহি জানান, ইয়েমেন সীমান্তবর্তী সৌদি শোধনাগারগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল ডিজেল সুয়েজ খাল দিয়ে ইউরোপে যায়। হুতিদের হুমকির কারণে এই সরবরাহ এখন অনিশ্চিত। এদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে গত কয়েক সপ্তাহে ডিজেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ৪০ সেন্টের বেশি বেড়েছে। গত মঙ্গলবার হুতিদের সতর্কবার্তা পাওয়ার পর অন্তত পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ লোহিত সাগর এড়িয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে। ইয়ানবু থেকে চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া একটি বড় তেলবাহী ট্যাংকারও ইয়েমেন উপকূলের কাছ থেকে ফিরে এসেছে বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন একটি ফরচুন ৫০০ কোম্পানির ঝুঁকি ব্যবস্থাপক।
এই পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হুতিরা বড় কোনো পদক্ষেপ নিলে মার্কিন সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তবে বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বিভিন্ন বন্দর অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালি সচল রাখার কাজে ব্যস্ত রয়েছে। সম্প্রতি ইরানের হামলার কারণে একাধিক ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এমনিতেই ব্যাপক কমে গেছে। জুনের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন-ইরান সমঝোতার পর যেখানে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০টি জাহাজ চলাচল করত, এখন তা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একই সাথে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—এই দুই প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মার্কিন বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।



























