বঙ্গোপসাগরকে শান্তির অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা
- আপডেট সময় : ০৫:১৫:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থায় এশিয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের মিলনস্থল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। অঞ্চলটি বর্তমানে বিশাল সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর এই অঞ্চলে নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, যা একটি স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। তবে বড় প্রশ্ন হলো, এই স্বার্থের প্রতিযোগিতা কি বিভাজন তৈরি করবে, নাকি পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অঞ্চলটিকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক এলাকায় পরিণত করবে?
বন্দর, রেলপথ, শিল্পাঞ্চল, জ্বালানি সংযোগ এবং ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থাকে শুধু কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে দেখলে তা উত্তেজনার কারণ হতে পারে। কিন্তু এগুলোকে যদি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে তা শান্তির শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ বিভিন্ন অঞ্চল ও সংস্কৃতির মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করার সুযোগ রাখে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে একটি বাস্তব কূটনৈতিক পথ। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো দেশকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয় না, বরং পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে সহযোগিতা সম্ভব। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বর্ধিত সহযোগিতা, আসিয়ান উদ্যোগ এবং বিমসটেকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রমাণ করে যে শান্তি ও উন্নয়নের জন্য যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্ব বাড়ছে।
বঙ্গোপসাগরকে প্রতিযোগিতার বিভাজনরেখা না বানিয়ে সহযোগিতার সেতুবন্ধন হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা এবং বৃহত্তর অংশীদার দেশগুলো যদি এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সুফল পায়, তবেই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এই চিন্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সম্মিলিতভাবে এই দেশগুলোর বিপুল জনসংখ্যা ও তরুণ কর্মশক্তি বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী ও সম্মানজনক ভূমিকা রাখতে পারে। এটি কোনো শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নয়, বরং সমতার ভিত্তিতে বিশ্ব অংশীদারিত্বের আহ্বান।
একবিংশ শতাব্দীর প্রকৃত সাফল্য সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না, বরং কত বেশি মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এবং শান্তিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বাস্তবতায় রূপান্তর করা যায়, তার ওপর নির্ভর করবে। যদি বঙ্গোপসাগর ঘিরে থাকা দেশগুলো এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, তবে এই অঞ্চল বিশ্বকে একটি শিক্ষা দিতে পারবে যে, সঠিক নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে ভূগোল শান্তির সেতুবন্ধন হতে পারে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অবদান হবে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা এবং বিভিন্ন অংশীদারকে কাছে এনে শান্তি ও যৌথ সমৃদ্ধির পথে নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করা।




























