Header Premium (728×90)

ঋণ গ্রহণে ইসলামের নির্দেশনা ও পরিশোধের গুরুত্ব

ইসলামে অতি প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করা বৈধ, তবে অপ্রয়োজনে ধার করাকে চরম নিন্দনীয় কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। ঋণের বোঝা মানুষকে সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত, অপদস্ত ও ধিকৃত করে। অনেকে ঋণের বোঝা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। ঋণ মোমিনের জান্নাত লাভের অন্তরায়। তাই রাসুল (সা.) মৃতের সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টনের আগে তার ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে জোর তাগিদ দিয়েছেন (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৩৩)। এমনকি শহিদের সব গোনাহ মাফ হলেও ঋণ মাফ হয় না। রাসুল (সা.) বলেন, 'ঋণ ছাড়া শহিদের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।' (মুসলিম : ৪৭৭৭)।

ঋণের বোঝা থেকে পরিত্রাণ পেতে নির্ধারিত সময়ে তা পরিশোধ করা কর্তব্য, কারণ এটি একটি ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি। লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। ওয়াদা ভঙ্গের ফলে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি পর্যায়ে নানা সমস্যা ও সংকট সৃষ্টি হয়, পারস্পরিক সম্পর্কের ভীত নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং মানবিক মূল্যবোধ হ্রাস পায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'হে মোমিনরা, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।' (সুরা মায়িদা : ১)। কেয়ামতের দিন অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৪)। এছাড়া ওয়াদা ভঙ্গ করা মোনাফিকের আলামত, যেমনটি রাসুল (সা.) বলেছেন, 'মোনাফিকের আলামত তিনটি— কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে।' (বোখারি : ৩৩)।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে ঋণ পরিশোধে যথাযথ প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে অবশ্যই তিনি তাকে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দেবেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'যে কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।' (সুরা তালাক : ৩)। রাসুল (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি মানুষের মাল (ধার) নেয় পরিশোধ করার মানসে, আল্লাহ তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নেয় বিনষ্ট (গ্রাস) করার নিয়তে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।' (বোখারি : ২৩৮৭)।

দেনা পরিশোধে সক্ষম হয়ে অযথা টালবাহানা করা মহাঅন্যায় এবং এটি জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। রাসুল (সা.) বলেন, 'ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুম। যখন তোমাদের কাউকে (তার জন্য) কোনো ধনী ব্যক্তির হাওয়ালা করা হয়, তখন সে যেন তা মেনে নেয়।' (বোখারি : ২২৮৭)। তবে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যথাযথ পূর্ব পদক্ষেপ নেওয়ার পরও নির্ধারিত সময় কর্জ আদায়ে অক্ষম হলে সে গোনাহগার হবে না। অবশ্য তার করণীয় হলো, ঋণদাতার কাছে বিনম্রভাবে নিজের অপারগতা প্রকাশ করে সময় বাড়িয়ে নেওয়া।

ঋণদাতা যেহেতু ঋণগ্রহীতাকে বিপদে সাহায্য করেছে, তাই মানবতা হচ্ছে উৎকৃষ্ট পন্থায় পাওনাদারের ঋণ পরিশোধ করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, 'উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম ছাড়া আর কী হতে পারে!' (সুরা আর রহমান : ৬০)। ঋণদাতা রূঢ় আচরণ করলেও তার সঙ্গে সদাচরণ করা চাই। তদুপরি পূর্বশর্ত না করে থাকলে খুশি মনে তাকে কিছু বাড়িয়েও দেওয়া যায়। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে পাওনার জন্য তাগাদা দিতে এসে রূঢ় ভাষায় কথা বলতে লাগল। সাহাবিরা তাকে শায়েস্তা করতে উদ্যত হলে রাসুল (সা.) বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। কেননা, পাওনাদারের (কড়া) কথা বলার অধিকার রয়েছে।' তারপর তিনি বললেন, 'তার উটের সমবয়সী একটি উট তাকে দিয়ে দাও।' সাহাবিরা বললেন, 'এমন তো নেই, এর চেয়ে উত্তম উট রয়েছে।' তিনি বললেন, 'তাই দিয়ে দাও। তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোৎকৃষ্ট, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় উত্তম।' (বোখারি : ২৩০৬)।

পাওনাদারের সঙ্গে বিনম্র ব্যবহার করা মোমিনের বৈশিষ্ট্য। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সূত্রে বর্ণিত, এক গ্রাম্য লোক রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে কঠোর ভাষায় তাগাদা দিলো এবং বলল, 'আমার ঋণ পরিশোধ না করলে আমি আপনাকে নাজেহাল করব।' সাহাবিরা তার ওপর চড়াও হতে চাইলে রাসুল (সা.) বললেন, 'তোমরা কেন পাওনাদারের পক্ষ নিলে না?' অতঃপর তিনি কায়েসের কন্যা খাওলা (রা.)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে খেজুর ধার চাইলেন এবং তা দিয়ে বেদুঈনের পাওনা পরিশোধ করলেন। সে সন্তুষ্ট হয়ে বলল, 'আপনি পূর্ণরূপে পরিশোধ করলেন। আল্লাহ আপনাকে পূর্ণরূপে দান করুন।' রাসুল (সা.) বললেন, 'উত্তম লোকেরা এমনই হয়। যে জাতির দুর্বল লোকেরা জোর-জবরদস্তি ছাড়া তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না, সে জাতি কখনও পবিত্র হতে পারে না।' (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪২৬)।

পরিশেষে, যথাসময়ে ঋণ পাওয়া আল্লাহর মহা-অনুগ্রহ। দয়াময় রবের শোকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি যার মাধ্যমে অনুগ্রহ লাভ হয়েছে, তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া বাঞ্ছনীয়। রাসুল (সা.) বলেন, 'মানুষের প্রতি যে ব্যক্তি কৃতজ্ঞ নয়, আল্লাহর প্রতিও সে কৃতজ্ঞ নয়।' (তিরমিজি : ১৯৫৫)। রাসুল (সা.) ঋণ গ্রহণ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন ও দোয়া করতেন (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪২৪)। কাউকে অনুগ্রহ করা হলে 'জাযাকাল্লাহু খাইরান' বলে দোয়া করার নির্দেশনা এসেছে হাদিসে (তিরমিজি : ২০৩৫)।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh

Recent Posts

কিউবার বিপ্লব কি শেষের পথে? বিশ্বরাজনীতিতে এর প্রভাব ও গুরুত্ব

কিউবার বিপ্লব কি শেষ হতে চলেছে? মার্কিন চাপ ও অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্বরাজনীতিতে কিউবার…

6 minutes ago

এ মাস থেকেই বাড়তি বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা

নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীরা চলতি মাস থেকেই বাড়তি বেতন পেতে শুরু করবেন। তবে…

24 minutes ago

মাদক নির্মূলে গিয়েছিলাম, জমি দখল বা চাঁদাবাজি নয়: ইশরাক

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, মাদক নির্মূলের উদ্দেশ্যেই তিনি অভিযানে গিয়েছিলেন। তিনি…

1 hour ago

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইলেন ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চেয়েছেন দুর্যোগ…

1 hour ago

রায়ের কপি পেলে বিস্তারিত জানাতে পারব: শামা ওবায়েদ

সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় আদালতের রায়ের কপি হাতে পেলে বিস্তারিত তথ্য…

1 hour ago

১৩০ বছর বয়সে হজ করা আলজেরিয়ার প্রবীণ নারী আর নেই

১৩০ বছর বয়সে পবিত্র হজ পালন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসা আলজেরিয়ার প্রবীণ নারী হাজ্জা সারহুদা…

1 hour ago

This website uses cookies.