Header Premium (728×90)

কিউবার বিপ্লব কি শেষের পথে? বিশ্বরাজনীতিতে এর প্রভাব ও গুরুত্ব

কিউবার বিপ্লবের রয়েছে নানা বৈপরীত্য। তবু বিশ্বকে অনেক কিছু দিয়েছে এই বিপ্লব। এর পতন হলে তা হবে বিশ্বের জন্য বড় এক ক্ষতি। বর্তমানে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নজর কিউবার দিকে। চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় ওয়াশিংটনের সামরিক অভিযান ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ কিউবায় একই ধরনের পদক্ষেপের পথ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন অনেকে। সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কিউবার আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার কথা উঠে এসেছে। দেশটির কর্মকর্তারাও বারবার বলেছেন, তারা ‘কিউবাকে স্বাধীন’ দেখতে চান। যুক্তরাষ্ট্র কখন বা কীভাবে কিউবার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন লক্ষণ বলছে, কিউবার বিপ্লব হয়তো শেষ পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বরাজনীতিতে মাত্র এক কোটি মানুষের এই দেশটির প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল, তা ফিরে দেখা জরুরি।

কিউবার ভূমিকা বুঝতে ইয়োরুবা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত সান্তেরিয়া ধর্মের শক্তিশালী আত্মা এশুর কথা মনে পড়ে। এশুকে বলা হয় দেবতাদের বার্তাবাহক, সংযোগস্থলের রক্ষক এবং অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যকার সেতুবন্ধ। লোককাহিনিতে তাকে দেখা যায় এমন এক চতুর চরিত্র হিসেবে, যে নিজের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মানুষকে বিনয় ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা, প্রতিষ্ঠিত ধারণা ভেঙে দেওয়া এবং আড়ালে থাকা সত্য সামনে আনা—এশুর চরিত্রের এসব বৈশিষ্ট্য কিউবার সঙ্গেও মিলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কিউবা বহুবার এমন প্রশ্ন তুলেছে, বিশ্ব আসলে কেমন হওয়া উচিত। কখনো দেশটি মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে, কখনো আবার যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তব আচরণের পার্থক্য নিয়ে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা যায়। হাভানা দখলের মাত্র এক বছর পর কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যান। তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তব্যে অস্বস্তিতে থাকা মার্কিন সরকার কয়েকটি নামী হোটেলকে কাস্ত্রো ও তার সফরসঙ্গীদের থাকার ব্যবস্থা না করতে চাপ দেয়। কিন্তু কিউবার প্রতিনিধিদল থেমে থাকেনি। তারা হারলেমে গিয়ে থেরেসা হোটেলে ওঠে। এরপর সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। কাস্ত্রো এই সুযোগে কিউবার প্রতিনিধিদলের প্রতি বৈষম্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বর্ণবাদের কারণে কৃষ্ণাঙ্গদের হোটেল ও অন্যান্য সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনার তুলনা করেন। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। নিউইয়র্কের মতো উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত শহরেও বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে আসে। পরবর্তী বছরগুলোতে কিউবা আন্তর্জাতিকতাবাদী নীতি গ্রহণ করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পিস কর্পস ও ইউএসএআইডির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বিস্তারের বিপরীতে কিউবা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষি বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ পাঠাতে থাকে। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, দেশটি ১৬৪টি দেশে চার লাখ পর্যন্ত চিকিৎসক পাঠিয়েছে। ভেনেজুয়েলা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভিয়েতনামের মতো দেশে কিউবার এই সহায়তা দেশটির প্রতি গভীর সমর্থন তৈরি করে। এসব দেশে কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার পরিচিতি অনেকটা জাতীয় বীরদের মতো।

কিউবার আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ১৯৬১ সালের বে অব পিগস আক্রমণ প্রতিহত করা। সিআইএর সহায়তা ও অর্থায়নে নির্বাসিত কিউবানদের পরিচালিত এই অভিযান কিউবার বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছিল। এ ছাড়া ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলন ও দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতিও কিউবা সমর্থন জানায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি কিউবান সেনা অ্যাঙ্গোলায় যুদ্ধে অংশ নেন। কিউবার ‘অপারেশন কার্লোটা’ নামে পরিচিত এই সামরিক হস্তক্ষেপ অ্যাঙ্গোলা ও প্রতিবেশী নামিবিয়ার স্বাধীনতার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পথেও প্রভাব ফেলে। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, কিউবার হস্তক্ষেপ শ্বেতাঙ্গ নিপীড়কের অজেয় হওয়ার ধারণা ভেঙে দিয়েছিল।

কিউবার বিপ্লবের আরেকটি দিক হলো দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যেও টিকে থাকা। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই অবরোধ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও কিউবা অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনে, কিছু ক্ষেত্রে উদারীকরণ করে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। পাশাপাশি দেশটি টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। তবে কিউবার বিপ্লবের সাফল্যের পাশাপাশি বড় ব্যর্থতাও রয়েছে। রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করা, মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা দমন এবং তথ্য ও ইন্টারনেট ব্যবহারে বিধিনিষেধ দেশটির কর্তৃত্ববাদী শাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনাকে জোরালো করেছে। ২০২১ সালের জনপ্রিয় বিক্ষোভও কঠোরভাবে দমন করা হয়। কিন্তু কিউবার এই সীমাবদ্ধতার দিকে তাকালে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের পরিস্থিতিও উপেক্ষা করা যায় না। ২০২৬ সালে দেশটিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়া, দুর্নীতি, নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার, সংবাদমাধ্যম ও ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ এবং নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার মতো বিষয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। গুয়ানতানামো বে-তে বিতর্কিত বন্দিশিবিরে আটক ব্যক্তিদের অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন জিইয়ে রেখেছে।

কিউবার বিপ্লব শেষ হয়ে আসছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং কিউবার দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। বিপ্লবের পতন হলে মায়ামির রাস্তায় আনন্দ উদ্‌যাপন হতে পারে। কিন্তু বিশ্বের অন্য জায়গায় অনেকে শোক প্রকাশ করবেন—শুধু বিপ্লবের জন্য নয়, বরং এটি যে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার ধারণা সামনে এনেছিল, তার জন্যও। কিউবার বিপ্লব নিখুঁত ছিল না। তবু এটি দেখিয়েছে, একটি ছোট দেশও পরাশক্তির আধিপত্যকে প্রশ্ন করতে পারে। সেই প্রশ্ন তোলার শক্তি হারিয়ে গেলে বিশ্ব কি আরও বেশি প্রশ্নহীন সাম্রাজ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষমতাকাঠামোর দিকে এগোবে? কিউবার গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা যেমন জরুরি, তেমনি নিজেদের ঘোষিত আদর্শের প্রতিও সৎ থাকা জরুরি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ গণমাধ্যম: প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) কার্যনির্বাহী কমিটির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে গণতান্ত্রিক…

36 minutes ago

আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পুলিশ স্টেশনে আগুন ও সহিংসতা

আলবেনিয়ায় কয়েক দিন ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার বিক্ষোভকারীরা একটি পুলিশ স্টেশনে…

38 minutes ago

এ মাস থেকেই বাড়তি বেতন পাবেন সরকারি চাকরিজীবীরা

নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীরা চলতি মাস থেকেই বাড়তি বেতন পেতে শুরু করবেন। তবে…

1 hour ago

মাদক নির্মূলে গিয়েছিলাম, জমি দখল বা চাঁদাবাজি নয়: ইশরাক

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, মাদক নির্মূলের উদ্দেশ্যেই তিনি অভিযানে গিয়েছিলেন। তিনি…

2 hours ago

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাইলেন ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চেয়েছেন দুর্যোগ…

2 hours ago

রায়ের কপি পেলে বিস্তারিত জানাতে পারব: শামা ওবায়েদ

সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় আদালতের রায়ের কপি হাতে পেলে বিস্তারিত তথ্য…

2 hours ago

This website uses cookies.