বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকিয়ে একক প্রার্থী নিশ্চিত করাই বিএনপির বড় পরীক্ষা
- আপডেট সময় : ০৭:৪৬:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

আগামী নভেম্বরের শেষভাগে ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জন্য এই নির্বাচন এক বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা সামাল দিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভোটব্যাংক অক্ষুণ্ণ রাখতে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার কৌশল নিয়েছে দলটি। তবে এই কৌশল মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে নেতাকর্মী ও বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে রাজশাহী মহানগর বিএনপির এক অনুষ্ঠানে দলটির শীর্ষ নীতি-নির্ধারক ও বর্তমান ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু স্পষ্ট করে জানান, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে সারা দেশে বিএনপির একক প্রার্থী সুনিশ্চিত করা হবে। কেন্দ্র ও স্থানীয় সমন্বয় কমিটির আলোচনার ভিত্তিতে একজনকে চূড়ান্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নীতি-নির্ধারকদের ধারণা, একই আসনে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোটব্যাংক বিভক্ত হয়ে যাবে এবং সেই সুযোগ নিতে পারে বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত ইতিমধ্যেই জেলা ও উপজেলাগুলোতে সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করে জনসংযোগ শুরু করেছে। রাজশাহী সিটি জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল জানিয়েছেন, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাদের মেয়র ও চেয়ারম্যান প্রার্থী চূড়ান্ত করে তারা একক প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমেছেন। পাশাপাশি ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে আইনিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একটি অংশও স্বতন্ত্র বা নির্দলীয় মোড়কে ভোটের মাঠে নামার গোপন ছক কষছে। এই বহুমাত্রিক সমীকরণে জয় নিশ্চিত করতে বিএনপি হাইকমান্ডের সামনে একক প্রার্থী ফর্মুলার বিকল্প নেই।
কাগজে-কলমে এই সিদ্ধান্ত সহজ মনে হলেও সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ অত্যন্ত কঠিন। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে বরিশাল ও খুলনা বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের প্রশাসক বা অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও রূপগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দলীয় সক্রিয় নেতাদের দায়িত্বশীল পদে বসানো নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি তোলা হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিজেদের অনুকূলে নিতে এবং প্রশাসনে একক আধিপত্য বিস্তার করতে ক্ষমতাসীন দল ইউপিগুলোতে দলীয় অনুসারীদের বসাচ্ছে, যা বৈষম্য তৈরি করতে পারে। তবে এই অভিযোগ নাকচ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সব ধরনের প্রশাসনিক সহযোগিতা দেবে এবং নির্বাচনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখবে। কে হারল বা জিতল তা সরকারের দেখার বিষয় নয়।
আইনি ও প্রশাসনিক বিতর্কের বাইরে বিএনপির বড় সংকট লুকিয়ে আছে তাদের নিজস্ব ঘরোয়া রাজনীতির অন্দরে। গত জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত নতুন সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের অনুগত কর্মী-supporters-দের স্থানীয় সরকারে দেখতে চান। এর ফলে স্থানীয় সাংগঠনিক কমিটির সাথে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতার এক অলিখিত দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ত্যাগী নেতাদের জেলা কমিটি সমর্থন দিলেও সংসদ সদস্যরা নতুন বা অনুগত প্রার্থীদের জন্য কেন্দ্রের ওপর চাপ দিচ্ছেন। যেমন, ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদের জন্য বিএনপিরই অন্তত ৯ জন প্রভাবশালী নেতা প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং প্রত্যেকেই নিজেদের দাবিতে অনড়। বিগত সাধারণ নির্বাচনেও দলটির কড়াকড়ি সত্ত্বেও অন্তত ৭২টি আসনে বিএনপির নিজস্ব বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যা মূল প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধানে বড় প্রভাব ফেলেছিল।
দল ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূলের রাজনীতিতে 'অনুপ্রবেশের রাজনীতি' আরেকটি বড় পরিবর্তন এনেছে। ক্ষমতার সুফল পেতে বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীরা এখন বিএনপির স্থানীয় নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় ভিড় করছেন। এতে ত্যাগী কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিতর্কিত কাউকে একক প্রার্থী হিসেবে চাপিয়ে দিলে কর্মীরা নীরব অন্তর্ঘাত করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফেনী, নোয়াখালী কিংবা চট্টগ্রামের মতো বিএনপির ঐতিহ্যবাহী দুর্গগুলোতেও সাম্প্রতিক সময়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে চিন্তিত করে তুলেছে। তিনি ইতিমধ্যেই শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বেশ কিছু নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।
দলের সিনিয়র নেতা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য তৃণমূলকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে কোনো পকেট বা স্বজনপ্রীতি চলবে না। প্রার্থীর জনপ্রিয়তার সুনির্দিষ্ট ডেটা বা রিপোর্ট দেখেই কেবল দলের চেয়ারম্যান মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন। এদিকে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও জাতীয় প্রতীকের বিধান বাতিল করা হয়েছে। নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণ নির্দলীয় এবং সাধারণ প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডু বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করতে হবে এবং কোনোভাবেই বিদ্রোহী প্রার্থী রাখা যাবে না। কেউ বিদ্রোহী হলে তাকে প্রথমে ডেকে সমঝোতার চেষ্টা করা হবে, এরপরও শৃঙ্খলা না মানলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. নঈম আকতার সিদ্দিক মনে করেন, প্রতিটি ইউনিয়নে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করার পর বাকি প্রার্থীদের মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে অনেক নিশ্চিত আসনেই বিএনপিকে পরাজয় বরণ করতে হতে পারে, যা সদ্য ক্ষমতায় আসা দলটির ভাবমূর্তির জন্য সুখকর হবে না। এই নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা ও মাঠের জনপ্রিয়তা প্রমাণের এক মহাযুদ্ধ।





























