এডওয়ার্ড সাঈদের তাত্ত্বিক আলোয় কাজী নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার পাঠ
- আপডেট সময় : ০৪:৫৬:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

কাজী নজরুল ইসলামকে সচরাচর কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে এই সংজ্ঞায় একটি ঝুঁকি রয়েছে, কারণ বিদ্রোহকে কেবল ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক ক্রোধের সমার্থক মনে করলে নজরুলের সাহিত্যের অন্তর্নিহিত গভীরতা আড়াল হয়ে যায়। তার বিদ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট শাসকের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি সেই সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যা মানুষকে শ্রেণি, ধর্ম, জাত, লিঙ্গ ও ক্ষমতার বিভিন্ন বিন্যাসে বিভক্ত করে। এই প্রেক্ষাপটে এডওয়ার্ড সাঈদের দার্শনিক চিন্তার আলো নজরুলকে নতুনভাবে পাঠের একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে।
সাঈদের ‘কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম’ গ্রন্থের মূল বক্তব্য অনুযায়ী, সাহিত্যকে তার নান্দনিক স্বায়ত্তশাসনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। প্রতিটি সাংস্কৃতিক রূপই সাম্রাজ্য, পুঁজি, জাতীয়তা ও প্রতিরোধের বৃহত্তর ভূগোলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সাঈদের ‘কনট্রাপান্টাল রিডিং’ বা প্রধান সুরের পাশাপাশি চাপা পড়া প্রতিসুর শোনার পদ্ধতিটি নজরুলকে বুঝতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে নজরুল কেবল ‘বাংলার বিদ্রোহী কবি’ থাকেন না, বরং তিনি ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক প্রতিসাংস্কৃতিক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদের ভেতরের সাম্প্রদায়িকতা ও পিতৃতন্ত্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সাঈদ ও নজরুল—উভয়ের কাছেই সংস্কৃতি কোনো নির্দোষ ক্ষেত্র নয় এবং ভাষা একটি রাজনৈতিক ভূখণ্ড। ব্রিটিশরা কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং উপনিবেশিত মানুষকে ‘সভ্য-অসভ্য’ বা ‘শাসক-শাসিত’ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি বিশেষ ভাষ্য তৈরি করেছিল। নজরুল এই শ্রেণিবিন্যাসের বিরুদ্ধে ‘মানুষ’ শব্দটিকে তার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে স্থাপন করেন। তার সাম্যবাদী কবিতার উচ্চারণ—‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’—কেবল মানবতাবাদী বাণী নয়, বরং এটি ঔপনিবেশিক পরিচয় থেকে মানুষকে মুক্ত করার একটি রাজনৈতিক পুনর্নামকরণ।
১৮৯৯ সালে চুরুলিয়ায় জন্ম নেওয়া নজরুলের জীবনপথও কোনো সাধারণ জীবনী নয়, বরং তা ঔপনিবেশিক ভারতের সামাজিক ভূগোলের মধ্য দিয়ে এক মানুষের যাত্রা। মক্তব থেকে সেনানিবাস, গ্রাম থেকে মহানগর—তার জীবনের এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাকে এক পরিচয়ের মধ্যে স্থির থাকতে দেয়নি। যদিও সাঈদের ‘এক্সাইল’ বা স্থানচ্যুতির ধারণার সঙ্গে নজরুলের জীবন হুবহু মেলে না, তবুও তার সীমানা অতিক্রমের অস্থিরতাই তার সৃষ্টিশীলতার মূল শক্তি।
নজরুলের ধর্মচেতনাকে সাঈদীয় পদ্ধতিতে পাঠ করা সবচেয়ে ফলপ্রসূ। তিনি ইসলামী ঐতিহ্যের সন্তান হয়েও হিন্দু পুরাণ, শাক্ত ও বৈষ্ণব সংগীত এবং পারস্যীয় কাব্যভাণ্ডার সমান দক্ষতায় ব্যবহার করেছেন। তার এই ধর্মীয় বহুত্ব কেবল সম্প্রীতির উদাহরণ নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক ভূখণ্ড পুনর্দখলের কাজ। তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রতীক কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়। এই ‘অ্যান্টি-এসেনশিয়ালিজম’ বা মানুষকে একটিমাত্র পরিচয় বা পরিচয়ে আবদ্ধ করার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করাই নজরুলের বিদ্রোহের অন্যতম দিক।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার শক্তি তার ভাষার বিস্ফোরণে নিহিত। এখানে কবি নিজেকে ধ্বংস, সৃষ্টি, প্রেম ও পৌরাণিক স্মৃতির বাহক হিসেবে উপস্থাপন করে কোনো একক প্রশাসনিক পরিচয়ে আটকে থাকেননি। নজরুল সাম্রাজ্যের আরোপিত শ্রেণিবিন্যাসের বিরুদ্ধে নিজের আত্মপরিচয়কে পুনর্দখল করেছেন। তাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকে কেবল ব্রিটিশবিরোধী হিসেবে দেখা তার রাজনৈতিক অর্থের পরিধিকে সংকুচিত করে দেয়; এটি মূলত উপনিবেশিকভাবে সংজ্ঞায়িত আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে এক সাহসী অবস্থান।


























