বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ: পুলিশ প্রশাসনে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা

- আপডেট সময় : ০২:৫১:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

বদলি ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে গভীর অভ্যন্তরীণ সংকট ও তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাহিনীতে স্বস্তি ফেরার প্রত্যাশা থাকলেও, বর্তমানে ভিন্ন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মতোই পুলিশে বদলি বাণিজ্য সচল রাখতে একাধিক চক্র গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ধরনের অলিখিত পদায়ন বাণিজ্যের কারণে পেশাদার ও সৎ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ওপর। এই অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া ‘মব কালচার’ দমনেও পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ বাহিনীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত তালিকা বা ‘ফিট লিস্ট’ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), রেঞ্জের ডিআইজি এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট প্রধানের পদগুলোও তদবির ও অর্থের বিনিময়ে বণ্টন করা হচ্ছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশের একজন ডিআইজি জানান, সারা দেশে ৬৪টি জেলাসহ পুলিশ সুপারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে প্রায় ১০০টি। অথচ বর্তমানে এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তার সংখ্যা ৭০০-এরও বেশি। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাচভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে ফিট লিস্ট তৈরি করে পদায়ন করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ফলে তদবিরের জোরে অযোগ্য ও তোষামোদকারী কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং পেয়ে যাচ্ছেন। আবার এসব বিতর্কিত পোস্টিংয়ের তথ্য প্রমাণসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তড়িঘড়ি করে তাদের প্রত্যাহার করা হচ্ছে, যা পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ক্ষোভ দূর হওয়ার বদলে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে ক্ষোভের জন্ম হচ্ছে। বিএনপি বা অন্য রাজনৈতিক ঘরানার ট্যাগ লাগিয়ে পূর্বে যাদের বঞ্চিত রাখা হয়েছিল, এখন তাদের প্রাপ্য পদোন্নতিকে কেন্দ্র করেও নতুন করে বাধা ও বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া সহকর্মীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে কাজে লাগিয়ে কয়েকজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে ‘আওয়ামী ট্যাগ’ দিয়ে জোরপূর্বক বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এভাবে অবসরে পাঠানোর কারণে বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে, যা কাজের স্পৃহা ও পেশাদারত্বকে ব্যাহত করছে।
এ বিষয়ে একজন অতিরিক্ত ডিআইজি মন্তব্য করেন, অর্থের বিনিময়ে পদ পাওয়ার কারণে অনেক কর্মকর্তার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগ করা টাকা তুলে আনা। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি তাদের কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর অধস্তনদের আস্থা কমে গেছে। অতীতে সংকটের সময় শীর্ষ কর্মকর্তাদের পালিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্তের কারণে বর্তমান অধস্তন কর্মকর্তারাও ভাবছেন যে সংকটকালে বর্তমান নেতৃত্ব একই কাজ করতে পারে। এই আশঙ্কায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা নিজেদের কাঁধে দায় নিয়ে কাজ করতে ভয় পাচ্ছেন। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অর্থলিপ্সা ও অদূরদর্শিতার কারণে মাঠপর্যায়ের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, এর খেসারত শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দিতে হবে।
এদিকে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে বদলি ও পদায়ন নিয়ে চলমান গুঞ্জনের মধ্যে সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) প্রটোকল বা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক বডিগার্ডের এই ফোনালাপ ফাঁসের পর পুলিশে চলমান গোপন ‘বদলি বাণিজ্য’ ও সিন্ডিকেটের চিত্র আবারও সামনে এসেছে। এই অডিওতে কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদের সদস্যদের পছন্দমতো জায়গায় বদলি করতে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা লেনদেনের বিষয়টি উঠে এসেছে। ফোনালাপে ইঙ্গিত রয়েছে যে, কীভাবে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে মাঠপর্যায়ের বদলি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং এই লেনদেনের টাকা কার কার হাত ঘুরে ফাইল ছাড় করানো হয়।
এর আগে গত মে মাসের শেষ দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাশেমের একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। ওই অডিওতে তাকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘পুলিশের চাকরি ওয়ান কাইন্ড অব বিজনেস। আমরা কেউ কাউকে ঠকাব না। সবাই মিলেমিশে থাকব। ধরেন ২ হাজার টাকা আমি খরচ করলাম, এই টাকা তো আমার বাড়ির টাকা না, বেতনের টাকাও না। আপনারা একটা অভিযোগ দিলেন ১ হাজার টাকা, আরেকটা খারিজ করে দিলেন ১ হাজার টাকা। ওইটা দিয়েই কিন্তু আমি পার করে দিলাম। তাইলে আমার তো রিস্ক নাই, নো টেনশন, খুব রিলাক্সে আছি।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘পুলিশের চাকরিটা এক ধরনের ব্যবসা। সবাই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না, তবে আমরা একজন আরেকজনকে সুরক্ষায় রাখছি। সবাই সমন্বয় করে চলতে হবে। ওসির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে পারবেন না। আমি আপনাদের ঠকাব না। আমার কনস্টেবলরা যেন তাদের প্রাপ্য পায়, তারা যেন বঞ্চিত না হয়। হক মারা আমি পছন্দ করি না।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। বর্তমান আইজিপির বিরুদ্ধে পুলিশের ভেতরে একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে এবং তারা নানা ধরনের অপতথ্য ছড়াচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া আইজিপির বডিগার্ডের অডিও রেকর্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন ইন্সপেক্টর আইজিপির বডিগার্ডকে ফোন করেছিলেন, যিনি পূর্বে আমার বডিগার্ড হিসেবেও কাজ করেছেন। পূর্বপরিচিত হওয়ার সুবাদে ওই ইন্সপেক্টর আইজিপির মাধ্যমে নিজের একটি তদবির করানোর জন্য বডিগার্ডকে বারবার অনুরোধ করছিলেন। বডিগার্ড যখন স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে এমন তদবির করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তখন বিশেষ উদ্দেশ্যে কথোপকথনটি রেকর্ড করা হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বডিগার্ডের কথায় পুলিশে বদলি করার কোনো সুযোগ নেই।

























