জাহাজভাঙা শিল্পকে লাল থেকে কমলা শ্রেণিতে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত
- আপডেট সময় : ০৩:৪৭:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশের জন্য সর্বোচ্চ দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করে এতদিন লাল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছিল। এই শ্রেণিবিন্যাসের কারণে ইয়ার্ড স্থাপনের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) সম্পন্ন করাসহ বিভিন্ন কঠোর ধাপ পার হতে হতো উদ্যোক্তাদের। তবে মালিকপক্ষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার এই শিল্পকে লাল থেকে কমলা শ্রেণিতে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে ইয়ার্ড স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষার মতো বাধ্যবাধকতা উঠে যাওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষ্যমতে, বর্তমান লাল শ্রেণিভুক্ত অবস্থায় ইয়ার্ডের অনুমোদন পেতে প্রায় ৯০ দিন সময় লেগে যায়, যা তাদের ব্যবসার জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে তারা বড় অংকের বিনিয়োগ করেছেন এবং হংকং কনভেনশন অনুযায়ী দেশে ১৫ থেকে ২০টি গ্রিন ইয়ার্ড গড়ে তুলেছেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে ছয় হাজার জাহাজ ভাঙার উপযোগী হবে, তাই গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ এই শিল্পের বড় একটি অংশ পাওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর জাহাজভাঙা শিল্পকে লাল থেকে কমলা শ্রেণিতে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট কমিটি। এই কমিটির নেতৃত্বে আছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তবে পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, এই কমিটিতে কোনো পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বা পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি রাখা হয়নি। পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, পরিবেশ ও শিল্প—দুটোকেই রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী, লাল শ্রেণির কারখানা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে। পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার মতে, এই পরিবর্তনের ফলে ইয়ার্ডের দূষণ মাত্রা ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়নের সুযোগ কমে যাবে এবং তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। বর্তমানে ইয়ার্ড স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের সদর দপ্তরে জনমত যাচাই ও ইআইএ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কমলা শ্রেণিতে চলে গেলে এ ধরনের কঠোরতা আর থাকবে না এবং বিভাগীয় কার্যালয় থেকেই অনুমোদন পাওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বিধিমালা শিথিল করা হলে তা জাহাজভাঙা দূষণ রোধে চলমান মামলা এবং আদালতের রায় ও আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, সেন্ট মার্টিন নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় পরিবেশবাদীদের ডাকলেও জাহাজভাঙা শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন তাদের মতামত নেওয়া হয়নি। পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলছেন, চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও শ্রমিকের জীবনের সুরক্ষায় এই শিল্পকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেই দেখা উচিত। বর্তমানে সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন এবং প্রতি বছর প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জাহাজ ভাঙা হয়।

























