ডেঙ্গুতে রেকর্ড সংক্রমণ ও প্রাণহানি, অক্টোবরে আরও অবনতির শঙ্কা
- আপডেট সময় : ০৭:০৫:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭৮ জন এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৬০ হাজার ৩৭৯ জন। গত বছরের এই সময়ে যেখানে ১৬৭ জনের মৃত্যু ও ৪০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেই তুলনায় এবার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উভয়ই উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। এ মাসের প্রথম ১৯ দিনেই ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৪ হাজার ৫৩৩ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন। গড়ে প্রতিদিন চারজনের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং ১,২৯১ জন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর ভিড় বাড়ছে। প্রায় প্রতিটি ঘরেই সর্দি, জ্বর, শরীর ব্যথা ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে মেঝে ও বারান্দায় পাতি পেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
আক্রান্তের দিক থেকে ঢাকা বিভাগ এখনও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৪ হাজার ২৯৪ জন, যা মোট আক্রান্তের ৪০.২ শতাংশ। এর পরেই ১৬.৪ শতাংশ হার নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খুলনা বিভাগ, যেখানে আক্রান্ত হয়েছেন ৯,৯০৩ জন। ঢাকা ও খুলনায় সম্মিলিতভাবে মোট আক্রান্তের হার ৫৬.৬ শতাংশ। অন্যদিকে, বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৩ জন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জনই নারী। তবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীরা, যার সংখ্যা ৮,৭৫১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬২.৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭.৪ শতাংশ নারী হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীদের হার বেশি—৫২ শতাংশ নারী এবং ৪৮ শতাংশ পুরুষ।
সারা দেশের বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে6,৯৮০ জন আক্রান্ত ও ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আক্রান্ত ৭,৩১৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। ঢাকার দুই সিটির বাইরে এই বিভাগে আক্রান্ত ৯,৯৯৭ জন এবং মারা গেছেন ১০ জন। এছাড়া বরিশালে ৮,৪৬৭ জন আক্রান্ত ও ১৩ জনের মৃত্যু, চট্টগ্রামে ৮,৬৭২ জন আক্রান্ত ও ১৬ জনের মৃত্যু, খুলনায় ৯,৯০৩ জন আক্রান্ত ও ৩২ জনের মৃত্যু, ময়মনসিংহে ৩,৩৬৬ জন আক্রান্ত ও ১৮ জনের মৃত্যু, রাজশাহীতে ৩,৬৩৮ জন আক্রান্ত ও ৮ জনের মৃত্যু, রংপুরে ১,৭৬২ জন আক্রান্ত ও ৪ জনের মৃত্যু এবং সিলেট বিভাগে ২৭৭ জন আক্রান্ত ও ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে ১৯৬০-এর দশকে প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়, যা তখন ‘ঢাকা ফিভার’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ২০০০ সালে চিকিৎসকরা এটিকে ডেঙ্গুজ্বর হিসেবে শনাক্ত করেন। ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১,৭০৫ জনের মৃত্যু এবং ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্তের রেকর্ড হয়েছিল। ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন আক্রান্ত ও ৫৭৫ জনের মৃত্যু এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনের মৃত্যু ও ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের মধ্যে গত চার বছর ডেন-২ প্রধান হলেও এবার ঢাকায় ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীর ৭১টি নমুনার মধ্যে ৯১.৫ শতাংশেই ডেন-৩ এবং ৮.৫ শতাংশে ডেন-২ পাওয়া গেছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধন কার্যক্রমের অবহেলা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবীরুল বাশার বলেন, ঢাকায় এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কিছুটা ব্যবস্থা থাকলেও ঢাকার বাইরে তা খুবই সীমিত। আমাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তিনি ফগিং পদ্ধতিকে অকার্যকর আখ্যা দিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রজনন উৎস ধ্বংসের তাগিদ দেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, তৃণমূল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়। কমিউনিটি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত জানিয়েছেন, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ এবং অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী বিশেষ কর্মপরিকল্পনা ও সমন্বিত রূপরেখা নেওয়া হয়েছে। ৩,০০০ চিকিৎসককে রিফ্রেশার ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত স্যালাইন ও বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে শুধু চিকিৎসা দিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।


























