স্বামীর নির্যাতনে একের পর এক নারীর মৃত্যু, আড়ালে থেকে যাচ্ছে অপরাধ
- আপডেট সময় : ০১:২১:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে আল মাইদা আক্তার (২০) ও মুক্তা ইসলাম নামে দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনা আবারও পারিবারিক নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে নিজের ক্ষতবিক্ষত মুখের ছবি খালাতো বোনের ফোনে পাঠিয়ে মাইদা লিখেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মারছে।’ অন্যদিকে, মুক্তা ইসলামকে চামড়ার বেল্ট দিয়ে পেটানোর ভিডিও তাঁর ভাইয়ের ফোনে পাঠিয়ে স্বামী বলেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’ এই দুই মৃত্যুর ঘটনা পারিবারিক সহিংসতার চরম বহিঃপ্রকাশ।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের শালমারা গ্রামের মো. সিয়াম আল মুরসালিন আকাশের (৩০) সঙ্গে ২০২১ সালে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বিয়ে হয় সাদুল্লাপুর উপজেলার ইদিলপুরের মেয়ে আল মাইদা আক্তারের। মাইদা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। তাঁদের চার ও এক বছর বয়সী দুটি ছেলেসন্তান রয়েছে। মাইদার মা মোছা. রহিমা খাতুন ভূমি অফিসে দলিল লেখার কাজ করে দুই সন্তানকে বড় করেছেন। মাইদার বাবা শাহাজাদা মিয়া আগেই মারা গেছেন এবং তাঁর বড় ভাই চীনে পড়াশোনা করছেন। বিয়ের পর থেকেই সিয়াম মাইদাকে মারধর করতেন বলে জানান তাঁর মা। এ নিয়ে একবার সালিসও হয়েছিল, যেখানে সিয়াম একে ‘স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সমস্যা’ বলে মেনে নিতে বলেছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে corkছটার দিকে সিয়াম তাঁর শাশুড়িকে ফোন করে জানান মাইদা অসুস্থ এবং পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছেন। রহিমা খাতুন হাসপাতালে গিয়ে মেয়ের মরদেহ দেখতে পান, আর জামাতা সিয়াম হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। পরে স্থানীয় লোকজন সিয়ামকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। মাইদার খালাতো বোন মোসাম্মৎ শাফিয়া জানান, মৃত্যুর দুই দিন আগে মাইদা তাঁকে ফোলা চোখ ও গালে ব্যান্ডেজ লাগানো একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন। শাফিয়া তাঁকে চলে আসতে বললেও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মাইদা সেখানেই থেকে যান। মাইদার চার বছরের সন্তানের বরাত দিয়ে শাফিয়া দাবি করেন, ‘বাবা মাকে অনেক মেরেছে, তারপর ফ্যানে ঝুলিয়ে দিয়ে সুইচ ছেড়ে দিয়েছে। পরে বাবার বন্ধুরা ফ্যান থেকে মাকে নামিয়ে আনে।’ পলাশবাড়ী থানার ওসি সারওয়ার আলম খান জানান, মাইদার গলায় দাগ ও পুরোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলেই সঠিক কারণ জানা যাবে। এ ঘটনায় মা রহিমা খাতুন বাদী হয়ে সিয়াম ও কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেছেন।
এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসা থেকে মুক্তা ইসলামের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদার তাঁকে খাটের সঙ্গে বেঁধে চামড়ার বেল্ট দিয়ে পেটানোর একটি ভিডিও তাঁর ভাই তানভীর রহমানের ফোনে পাঠিয়েছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, পাশের কক্ষ থেকে সন্তানদের কান্নার আওয়াজ পেয়ে মুক্তা স্বামীকে বলছিলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ কিন্তু সোহেল তাঁকে মারতে মারতে বলছিলেন, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে নির্যাতন করে হত্যা করার পর লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, নারী নির্যাতনের বেশিরভাগ অভিযোগই স্বামীর বিরুদ্ধে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আসা ২৭ হাজার ৯১১টি কলের মধ্যে ১৭ হাজার ১৯৬টি (প্রায় ৬২ শতাংশ) কল ছিল স্বামীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে, যা দৈনিক গড়ে ৭০টি। গত বছর এই হার ছিল ৫৮ শতাংশ। এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএ-এর ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাঁদের জীবনে অন্তত একবার স্বামীর হাতে কোনো না কোনো সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০১৫ সালে এই হার ছিল ৭৩ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ছিল ৮০ শতাংশ।
এই ঘটনাগুলো গত বছরের আগস্টে ঢাকার শেওড়াপাড়ায় চার সন্তানের জননী সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিনের (কেয়া) মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর স্বামী সিফাত আলীও স্ত্রীকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে রেখে পালিয়েছিলেন। পরে হাইকোর্টে জামিন আবেদন নাকচ হলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দেড় মাস পর জামিনে মুক্তি পান সিফাত। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি খবর গণমাধ্যমে এসেছে, যার মধ্যে ১১৯টি ঘটনায় মামলা হয়েছে। এই সময়ে ১০৮ জন নারী স্বামীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২২ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৬০টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ২৪৮টি মামলা হয়েছিল, যেখানে ২১৭টি হত্যাকাণ্ড ও ২৮টি নির্যাতনের ঘটনা ছিল।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার এবং নির্যাতন সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখার সামাজিক মানসিকতার কারণেই এই অপরাধ বাড়ছে। নারী নির্যাতন মামলার বিরুদ্ধে ‘৯৯ শতাংশ ভুয়া মামলা’ বলে যে অপপ্রচার চালানো হয়, তা বন্ধ করে বিচার নিশ্চিতের তাগিদ দেন তিনি। পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ‘আমরাই পারি’র প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, শুধু আইন সংস্কার নয়, মানুষের আচরণগত পরিবর্তন ও বিচারহীনতা দূর করতে রাষ্ট্রের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি প্রয়োজন। এদিকে তিন বছর বয়সে পিতৃহারা মেয়েকে হারিয়ে মা রহিমা খাতুন বিলাপ করে বলছেন, ‘আমার মেয়েটারে শ্বাসরোধ করে মারছে। আপনারা দেইখেন, ওর যেন ফাঁসি হয়।’


























