রাখাল থেকে সফল উদ্যোক্তা: সখীপুরে মোসলেমের বরই চাষে বাজিমাত
- আপডেট সময় : ০৮:৪০:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

একসময় অন্যের বাড়িতে রাখালের কাজ করতেন মোসলেম উদ্দিন। যে সামান্য আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চালানোই ছিল কঠিন। অভাবের কারণে ছোটবেলায় পড়াশোনা করতে না পারায় মানুষের বাড়িতে গরু-বাছুর চড়িয়ে জীবন শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৯৭ সালে বিয়ের পর সংসারের সচ্ছলতা আনতে তিনি ফেরি করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে আচার ও বাদাম বিক্রি শুরু করেন। কখনো বিদ্যালয়ের সামনে, কখনো বাজারে আচার-বাদাম বিক্রি করে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। ২০১০ সালের দিকে ১২ বছরের জন্য ছয় একর জমি ইজারা নিয়ে প্রথমবারের মতো লেবু চাষ শুরু করেন মোসলেম, যেখানে তিনি দ্রুত সাফল্য পান।
লেবুর বাগানে সাফল্যের পর মোসলেম নতুন কিছু করার কথা ভাবতে থাকেন। তার মনে হয়, নারীদের কাছে জনপ্রিয় টক বরইয়ের আচার তৈরির জন্য এই ফলের চাহিদা অনেক। এই ভাবনা থেকেই তিনি সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের কীর্ত্তনখোলা গ্রামে ১০ একর জমিতে আগাম জাতের টক বরই চাষ শুরু করেন। পরে উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের ইন্দারজানী গ্রামের সাতটি স্থানে আরও প্রায় ৪০ একর জমি ইজারা নিয়ে তিনি বরই চাষ সম্প্রসারণ করেন। সব মিলিয়ে এখন প্রায় ৫০ একর জমিজুড়ে তার বরইয়ের বাগান। গত আগস্টের শুরু থেকে তার বাগানের আগাম জাতের টক বরই বিক্রি হচ্ছে।
প্রতিদিন বাগান থেকে ৮ থেকে ১০ বস্তা বরই ঢাকার কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারের পাইকারি আড়তে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিটি বস্তায় প্রায় ৬০ কেজি বরই থাকে এবং প্রতি কেজি আগাম টক বরই ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন ৭২ হাজার থেকে ৯৬ হাজার টাকার বরই বিক্রি হচ্ছে। মোসলেম জানান, মৌসুমের ভরা সময়ে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ টাকার বরই বিক্রি হয়। এ মৌসুমে তিনি অন্তত এক কোটি টাকার বরই বিক্রির আশা করছেন। এরই মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছেন তিনি। গত মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন কম হওয়ায় ৫০ লাখ টাকার বরই বিক্রি করলেও খরচ বাদে লাভ ছিল ছয়-সাত লাখ টাকা। তবে এবার এক কোটি টাকার বরই বিক্রি হলে ৩০ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।
বরইয়ের বাগান শুধু মোসলেমের ভাগ্যই বদলায়নি, কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। তার বাগানে সারা বছর স্থায়ীভাবে কাজ করেন প্রায় ১৫ জন শ্রমিক। বরই পাড়ার মৌসুমে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক কাজ করেন। এছাড়া বিভিন্ন খাদ্যপণ্য ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তার বাগানের বরইয়ের বড় ক্রেতা হওয়ায় বিক্রির দুশ্চিন্তাও নেই।
একসময় দোচালা ছনের ঘরে থাকা মোসলেম এখন সখীপুরের গজারিয়া ইউনিয়নের ধুমখালী এলাকায় নিজের কেনা প্রায় এক একর জমিতে তিনতলা বাড়ির মালিক। তার এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলের মধ্যে বড়জন ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স শেষ করে মালয়েশিয়ার লিঙ্কন ইউনিভার্সিটি কলেজে পড়াশোনা করছেন। ছোট ছেলে সখীপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন।
সখীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন বলেন, আগাম জাতের টক বরই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে মোসলেম সফলতা অর্জন করেছেন। সখীপুরের মাটি বিভিন্ন ধরনের ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। মোসলেমের এই সাফল্য দেখে সখীপুরের অনেক কৃষক এখন বরই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। মোসলেমের মতে, লাভজনক ফলের বাগান করতে হলে জাত নির্বাচন, পরিচর্যা ও বাজারজাত—এই তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয়।




























