ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে টানাপোড়েন, শুভর লাশ দাফনের নির্দেশ হাইকোর্টের
- আপডেট সময় : ০৪:৪৫:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালের (৩২) লাশ দাফন নাকি দাহ করা হবে—তা নিয়ে মা ও বাবার মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে এই টানাপোড়েনের কারণে মৃত্যুর ছয় দিন পরও তাঁর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে রয়েছে। তবে গত বৃহস্পতিবার এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, শুভর দাফন নিয়ে মা ও বাবার মধ্যে মতভেদ তৈরি হওয়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বর্তমানে মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের হিমঘরে রাখা হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুভর মা পার্বতী রানী দাস ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। ২০০৩ সালে পার্বতী রানী তাঁর তিন সন্তানসহ (দুই ছেলে ও এক মেয়ে) হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর তাঁর নাম হয় আয়েশা বেগম। দুই ছেলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মো. বিল্লাল ও ইব্রাহিম (পূর্বের নাম সুজন)। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) শুভর নাম পরিবর্তন করা হয়নি।
শুভর ছোট ভাই ইব্রাহিম জানান, ধর্মান্তরের পর থেকেই তাঁরা মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন করছেন। শুভ ছোটবেলায় মাদ্রাসাতেও পড়াশোনা করেছেন। এখন তাঁদের বাবা হরি চন্দ্র দাস হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্য করতে চান এবং লাশ দাফনে বাধা দিচ্ছেন। প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে শুভ মুসলিম রীতিতে জ্যোতি আক্তারকে বিয়ে করেন। তাঁদের সুমাইয়া আক্তার নামে দুই বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তাঁরা ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী জীবিত থাকাকালীন বলে গিয়েছিলেন যে মৃত্যুর পর যেন তাঁকে মুসলিম রীতিতে দাফন করা হয়। কিন্তু তাঁর শ্বশুর পুলিশ পাঠিয়ে মাসদাইর কবরস্থান থেকে মরদেহ নিয়ে গেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁর স্বামী মারা গিয়েও শান্তি পাচ্ছেন না। তাঁরা চান ইসলামি রীতিতেই যেন দাফন সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে বাবা হরি চন্দ্র দাসের দাবি, শুভ হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন, তাই হিন্দু ধর্মীয় রীতিতেই তাঁর শেষকৃত্য করা উচিত।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলাম জানান, শুভর মায়ের আবেদনের পর প্রথমে লাশ দাফনের জন্য কবরস্থানে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুভর বাবা আইনজীবীর মাধ্যমে হিন্দু রীতিতে শেষকৃত্যের আবেদন করেন। পরে আদালতের নির্দেশে মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের হিমঘরে রাখা হয়। এর মধ্যে শুভর মা ও ভাই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
বিচারপতি ইকবাল কবির ও বিচারপতি সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফনের আদেশ দেন। রিটকারী আইনজীবী মো. জুয়েল আজাদ জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে আদেশ হওয়ায় কপি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। রোববার কার্যদিবসের শুরুতেই আদেশের কপি সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছাবে। জ্যোতি আক্তার জানান, রোববারে আদেশের কপি পাওয়ার পর মাসদাইরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে শুভর দাফন সম্পন্ন করা হবে।
এদিকে শুভ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। ৫ সেপ্টেম্বর লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৫টি গুলির খোসা ও ১০০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ইয়াবার প্রলোভন দেখিয়ে শুভর এক সহযোগীর মাধ্যমে তাঁকে ঘটনাস্থলে ডেকে এনে ১০-১২ জন মিলে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। রিমান্ডে থাকা এক আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়েছে।
সেখানে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তাঁকে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র কোপায়।
























