টাওয়ার ছাড়া মোবাইল নেটওয়ার্ক: বাণিজ্যিক অনুমোদন চায় বাংলালিংক
- আপডেট সময় : ০৩:০৯:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলালিংক দেশে টাওয়ার ছাড়াই সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মুঠোফোন নেটওয়ার্ক বা ‘ডিরেক্ট-টু-সেল’ (ডিটুসি) সেবা বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে চায়। মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে এই সেবা চালুর অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে আবেদন করেছে বেসরকারি এই মোবাইল অপারেটর। অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রাথমিকভাবে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের, যা পরবর্তীতে ভয়েস ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে স্টারলিংকের মাধ্যমে ডিরেক্ট-টু-সেল সেবা পরীক্ষার জন্য বিটিআরসির কাছে অনুমতি চেয়েছিল বাংলালিংক। পরে মে মাসে সরকার দুই মাসের জন্য ‘প্রুফ অব কনসেপ্ট’ (পিওসি) পরীক্ষার অনুমতি দেয়। প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক কভারেজের বাইরে থাকা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বান্দরবান ও দ্বীপ অঞ্চল সন্দ্বীপে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। বাংলালিংক জানিয়েছে, এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হয়েছে এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ বিভিন্ন সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে সফলভাবে এসএমএস, ওটিটি-ভিত্তিক মেসেজিং এবং ওটিটি ভয়েস কলের প্রদর্শনী করা হয়েছে।
সাধারণ মুঠোফোনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংকেত মূলত ভূমিতে থাকা মোবাইল টাওয়ারের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হয়। কোনো এলাকায় টাওয়ার না থাকলে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। কিন্তু ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তিতে মুঠোফোনের সংকেত সরাসরি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে গ্রাউন্ড স্টেশন হয়ে মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো, এর জন্য গ্রাহকের বিশেষ কোনো স্যাটেলাইট ফোন বা অতিরিক্ত যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না; প্রযুক্তিগতভাবে উপযোগী সাধারণ ফোর-জি ফোন ব্যবহার করেই এই সেবা নেওয়া সম্ভব।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে চারটি মোবাইল অপারেটরের মোট গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ১৯ কোটি এবং মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১২ কোটির কাছাকাছি। অপারেটরগুলোর নিজস্ব ও যৌথ মিলিয়ে সাড়ে ২৮ হাজারের বেশি টাওয়ার সচল থাকলেও দেশের সব অঞ্চলে নেটওয়ার্ক পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়, চর, দ্বীপ, উপকূল ও গভীর সমুদ্রে স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বেশি। ফলে এসব এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে সেবা পৌঁছাতে এই প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাণিজ্যিক অনুমোদনের জন্য বিটিআরসিকে দেওয়া চিঠিতে বাংলালিংক উল্লেখ করেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল টাওয়ার বা ফাইবার নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডিটুসি বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর হবে। এছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও অন্যান্য সামুদ্রিক পেশাজীবীরা, যাঁরা বর্তমানে নেটওয়ার্কের বাইরে থাকেন, তাঁরাও এর মাধ্যমে যোগাযোগের আওতায় আসবেন। বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান জানান, স্টারলিংকের এই প্রযুক্তি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার দারুণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সফল পরীক্ষার পর এখন তারা প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন।
তবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলেও বাণিজ্যিক সেবা চালুর ক্ষেত্রে কিছু আইনি ও কারিগরি জটিলতা রয়েছে। বিটিআরসির দেওয়া পরীক্ষামূলক অনুমতিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, একে বাণিজ্যিক অনুমোদনের নিশ্চয়তা হিসেবে ধরা যাবে না। এছাড়া আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) আওতায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মোবাইল সেবা দেওয়ার স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, যা ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিওকমিউনিকেশন কনফারেন্সে (ডব্লিউআরসি) নির্ধারিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক কাঠামোতেও বিটিআরসির এনজিএসও (নন-জিওস্টেশনারি অরবিট) স্যাটেলাইট সার্ভিস গাইডলাইনে এই লাইসেন্সের আওতায় স্যাটেলাইট ও স্থলভিত্তিক আইএমটি সেবা দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
অবশ্য বিটিআরসির একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা এই প্রযুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব রাখছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানান, ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন এখনো কমিশনের হাতে এসে পৌঁছায়নি। প্রতিবেদনটি পাওয়ার পর সার্বিক দিক বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অপারেটরগুলোর নিজস্ব টাওয়ার রয়েছে ২১ হাজার ৩৬৯টি।



























