ঘুষের টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কর্মস্থল ছাড়লেন বন কর্মকর্তা
- আপডেট সময় : ০৫:৫১:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

বঙ্গোপসাগর–সংলগ্ন নদ–নদীতে মাছ ধরার প্রত্যয়ন দেওয়ার নামে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠার পর পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবী ইউনিয়নের বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (বিট কর্মকর্তা) সোয়েব খান গোপনে তাঁর কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। কর্মস্থল ছাড়ার আগে তিনি ভুক্তভোগী জেলে ও স্থানীয় ব্যক্তিদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
এ–সংক্রান্ত ২০ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপ প্রথম আলোর হাতে এসেছে। ওই অডিওতে সোয়েব খানকে একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়ে আলোচনা করতে শোনা যায়। এ সময় একই পদে সদ্য যোগদান করা কর্মকর্তা জহির উদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন। অডিওর একটি পর্যায়ে সোয়েব খানকে বলতে শোনা যায়, ‘চর নিতে দুই পক্ষই টাকা দিয়েছে। যাকে চর দিতে পারব না, তার টাকা ফেরত দিয়ে যাব। কেউ যদি টাকা নিতে না চায়, তাহলে আমার কী করার আছে? আমি প্রত্যেকের টাকা ফেরত দিয়ে যাব। কারও এক টাকাও রাখব না। সবার ঝামেলা শেষ করেই এখান থেকে যাব।’
ভুক্তভোগী জেলে ইলিয়াস পাটোয়ারি জানান, নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ ধরার প্রত্যয়ন দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যয়ন না পাওয়ায় গত ২২ জুলাই রাতে তিনিসহ আরও কয়েকজন অভিযুক্ত কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে টাকা ফেরত চাইলে বিষয়টি গোপনে মুঠোফোনে ধারণ করেন।
সোয়েব খানের স্থলাভিষিক্ত কর্মকর্তা জহির উদ্দিন জানান, যোগদানের পর থেকেই তিনি স্থানীয়দের কাছ থেকে সোয়েব খানের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগগুলো শুনছেন। সোয়েব খান যথাযথভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন, এমনকি তিনি কবে গেছেন সে বিষয়েও জহির উদ্দিন অবগত নন। বর্তমানে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় জহির উদ্দিনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর–সংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরার জন্য নৌকা ও ট্রলারের মালিকদের বন বিভাগ থেকে প্রত্যয়ন নিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট মাপের ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের জন্য সরকার নির্ধারিত রাজস্ব বাবদ ৫৭৫ টাকা জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সোয়েব খান নদী–খালে মাছ ধরা এবং চর থেকে গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহের প্রত্যয়ন দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতি ২৫ হাজার থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছেন।
মৌডুবী ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি তানবীন বিশ্বাস জানান, তাঁর কাছ থেকে ৮৬ হাজার টাকা নেওয়ার পরও প্রত্যয়ন দেওয়া হয়নি। পরে টাকা ফেরত দেওয়ার নামে টালবাহানা শুরু করলে তিনি সোয়েব খানের ভিডিও স্বীকারোক্তি রেকর্ড করেন। পরবর্তীতে ২৫ জুলাই রাঙ্গাবালী উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব নিয়াজ আকনের মাধ্যমে তাঁকে ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়। স্থানীয় অন্তত ৩০ জন ব্যক্তি একই ধরনের আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মহাসীন উদ্দিন ভুঁইয়াও তাঁর কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন।
গত ২৩ জুলাই রাঙ্গাবালীতে যোগদান করা রেঞ্জ কর্মকর্তা আমীর হোসেন এলাকায় পরিদর্শনে গেলে ভুক্তভোগীরা তাঁর কাছে অভিযোগ করেন। তখন একটি কাগজে ভুক্তভোগীদের পরিচয় ও পাওনা টাকার বিবরণ লিখে স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তবে রেঞ্জ কর্মকর্তা আমীর হোসেন দাবি করেন, তিনি ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মৌখিক অভিযোগ পেয়েছেন, কিন্তু লিখিতভাবে কোনো স্বাক্ষর নেননি।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা সোয়েব খান মুঠোফোনে দাবি করেছেন, বদলি হওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অহেতুক অভিযোগ তোলা হচ্ছে এবং তিনি অধিকাংশ বিষয় সমাধান করেছেন। তবে বিস্তারিত আলোচনার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীতে তিনি আর সাড়া দেননি। পটুয়াখালীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. জাহিদুর রহমান মিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
৫০ ফুট দৈর্ঘ্য, ৬ ফুট প্রস্থ, ৪ থেকে ৬ ফুট গভীরতা ও ৫২০ মণ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের খরচি জাল দিয়ে মাছ ধরার প্রত্যয়ন নিতে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব বাবদ ৫৭৫ টাকা জমা দেওয়ার বিধান আছে।



























