ইতালিতে বিতর্কিত নির্বাচনী সংস্কার পাস, বিরোধীদের ‘প্রতারণার’ অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০২:৪৭:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

ইতালির নির্বাচনী ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ সুগম হলো। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন সরকারের আনা বিতর্কিত নির্বাচনী সংস্কার বিলটি দেশটির পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয়েছে। তবে এই সংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করে একে ‘প্রতারণামূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছে বিরোধী দলগুলো। তাদের অভিযোগ, আগামী নির্বাচনে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার পথ সুগম করতেই সরকার এই পরিবর্তন এনেছে।
বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এই ভোটে সংস্কারের পক্ষে ২২৭টি এবং বিপক্ষে ১৬৪টি ভোট পড়ে। নতুন এই আইনের ফলে ইতালির বর্তমান মিশ্র নির্বাচনী পদ্ধতি বাতিল হয়ে যাবে এবং তার পরিবর্তে পুরোপুরি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা চালু হবে। মেলোনির দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে নির্বাচনের পর স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সহজ হবে এবং দেশের সরকার আরও স্থিতিশীলতা পাবে। বর্তমানে ইতালির পার্লামেন্টের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য সরাসরি ভোটে এবং বাকিরা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। নতুন নিয়মে এখন থেকে যেকোনো দল বা জোটকে নির্বাচনের আগেই তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করতে হবে।
এই নতুন সংস্কারের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘বোনাস’ আসন ব্যবস্থা। নতুন আইন অনুযায়ী, কোনো দল বা জোট নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার পাশাপাশি যদি অন্তত ৪২ শতাংশ ভোট পায়, তবে তাদের সংসদে অতিরিক্ত ১০৫টি আসন দেওয়া হবে। এর মধ্যে নিম্নকক্ষে ৭০টি এবং সিনেটে ৩৫টি আসন বরাদ্দ থাকবে। এর ফলে খুব সামান্য ব্যবধানে জয় পেলেও সংসদে বড় ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মধ্য-বামপন্থী দলগুলো এই ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেছে। ভোটের আগে পার্লামেন্টে তাদের কয়েকজন সদস্য ‘প্রতারণার বিরুদ্ধে’ এবং ‘প্রতারণামূলক আইন’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ জানান। ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডি) নেতা এলি শ্লেইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে নির্বাচনী ব্যবস্থাই পরিবর্তন করা হোক না কেন, আমরা যেকোনো ব্যবস্থায় জিতব।’ অন্যদিকে, ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জিউসেপ্পে কন্তে মন্তব্য করেছেন, এই নতুন আইনটি আসলে ‘আসন্ন নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার জন্য তৈরি করা একটি জটিল পরিকল্পনা’।
এই ভোটাভুটি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা ছিল। এর আগে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, এই সংস্কার প্রস্তাবটি যদি প্রত্যাখ্যান করা হয়, তবে তিনি পদত্যাগ করে আগাম নির্বাচন দেবেন। ফলে গোপন ব্যালটের এই ভোটটি তাঁর নেতৃত্বের ওপর এক ধরনের আস্থার পরীক্ষা হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর মেলোনির সরকার ইতালিতে তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং গত মাসে তাঁর সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকারে পরিণত হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
যদিও এই নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে মেলোনির নিজের জোটের ভেতরেও কিছু মতপার্থক্য ছিল। তাঁর এই জোটে রয়েছে ব্রাদার্স অব ইতালি, ডানপন্থী লিগ এবং মধ্য-ডানপন্থী ফোরজা ইতালিয়া। তবে বিশ্লেষকেরা আগেই ধারণা করেছিলেন যে, বৃহস্পতিবারের ভোটে এই সংস্কার আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ মেলোনি যদি আগাম নির্বাচন দিতেন, তবে অনেক আইনপ্রণেতাই তাঁদের সংসদীয় পেনশনের যোগ্যতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তেন।
ভোটের পর মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর জোটের ঐক্যের প্রশংসা করে বলেন, মধ্য-ডানপন্থী জোট ‘ঐক্যবদ্ধ, সংহত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’। তিনি দাবি করেন, এই নতুন নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো যেকোনো রঙের রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা যেন সংসদে কার্যকরভাবে কাজ করার এবং স্থিতিশীল সরকার গঠনের সুযোগ পায়। মেলোনির বর্তমান সরকারের মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত রয়েছে। তবে তিনি চাইলে আগামী বসন্তেই নির্বাচন এগিয়ে আনতে পারেন। সে ক্ষেত্রে নতুন এই নির্বাচনী আইনটি আগামী নির্বাচনে ইতালির রাজনৈতিক সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।


























