ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এখন আর প্রান্তিক বিশ্বাস নয়, রাজনীতির কার্যকর অস্ত্র
- আপডেট সময় : ০৩:৫৮:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

‘সরকারের প্রতি অবিশ্বাস, যুদ্ধের মিথ্যা যুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার—সব মিলিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এখন আর সমাজের প্রান্তিক মানুষের বিশ্বাস নয়। এটি ক্ষমতার রাজনীতির একটি কার্যকর অস্ত্র।’ ইউটিউবের সার্চ বারে ‘৯/১১ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ লিখলে যে পৃথিবীটি খুলে যায়, সেখানে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা এখনো একটি অসমাপ্ত ঘটনা। ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে, নিহতদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং শেষও হয়েছে। কিন্তু ঘটনাটির ব্যাখ্যা নিয়ে সন্দেহের কোনো শেষ নেই।
কেউ দাবি করে সিআইএ সব জানত, কেউ বলে ডিপ স্টেট হামলাটি ঘটতে দিয়েছিল, আবার কেউ ইলুমিনাতির কথা বলে। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ার কি বিমান আঘাতে ধসে পড়েছিল, নাকি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে। এসব তত্ত্ব এখন আর প্রান্তিক নয়। জনপ্রিয় ভাষ্যকারেরা এসব নিয়ে আলোচনা করেন এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরা কখনো সরাসরি, কখনো ইঙ্গিতে একই সন্দেহকে সামনে আনেন। ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এখন ভোটার সংগঠিত করতে, রাজনৈতিক শত্রু তৈরি করতে এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতার সুবিধাজনক ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাষ্ট্র যখন নিজেই অবিশ্বাসের কারণ হয়ে ওঠে, তখন এই পরিবর্তন ঘটে। আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রের প্রতি সন্দেহের ইতিহাস দীর্ঘ। জন এফ. কেনেডি হত্যার পর থেকেই মানুষ প্রশ্ন করে এসেছে—সরকার যা বলছে, সেটিই কি পুরো সত্য? ৯/১১ সেই সন্দেহকে অন্য মাত্রা দেয়। কারণ হামলাটি ঘটেছিল সরাসরি সম্প্রচারের যুগে। নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক তত্ত্বের অধ্যাপক হুগো দ্রোশোঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের ক্ষমতাকেন্দ্রের ওপর এমন হামলা মানুষের নিরাপত্তাবোধকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
সন্দেহ শুধু ধ্বংসদৃশ্য থেকেই আসেনি, বরং পরবর্তী ঘটনাগুলোও এর পেছনে দায়ী। হামলার এক মাসের কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করে। দুই বছর পর ইরাক আক্রমণের জন্য যে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কথা বলা হয়েছিল, পরে তার অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। সরকার যখন যুদ্ধের কারণ হিসেবে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে, তখন অবিশ্বাস কেবল প্রশাসনের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি ছড়িয়ে পড়ে। দ্রোশোঁর মতে, “মিথ্যা অবিশ্বাস তৈরি করে। আর অবিশ্বাসের সঙ্গে ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে।”
ইন্টারনেট ও টেলিভিশন সংবাদ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বাজার তৈরি করেছে। গবেষক ডেভিড রবার্টসন বলেন, হামলার দৃশ্য মানুষকে প্রমাণের কথিত ফাঁকফোকর খুঁজতে উৎসাহিত করেছিল। ইন্টারনেট সেই সন্দেহগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দেয়। ইউটিউব আসার পর এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়। ‘লুস চেইঞ্’ নামের চলচ্চিত্রে মার্কিন সরকারের সংশ্লিষ্টতার যে দাবি করা হয়, তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের প্রশ্ন করা আর ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাস করা এক জিনিস নয়, কিন্তু যখন প্রমাণ ছাড়াই একটি গল্প সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন অনুসন্ধান থেমে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পার্থক্যটি অস্পষ্ট করে দিয়েছে, যেখানে জনপ্রিয়তাই বিশ্বাসযোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের রাজনৈতিক ব্যবহারের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ট্রাম্পের ‘বার্থার’ তত্ত্ব কেবল ওবামাকে আক্রমণ করার কৌশল ছিল না, এটি ছিল রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির পদ্ধতি। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি ‘ডিপ স্টেট’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন এবং কিউঅ্যাননের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বক্তব্যকে পরোক্ষভাবে শক্তি জোগান। বেকারত্ব, যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক সংকটের জটিল কারণগুলো তখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং সবকিছুর একটি সহজ উত্তর তৈরি হয়।
এই অনলাইন গল্পের বাস্তব পরিণতি দেখা যায় ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি। ২০২০ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির কোনো প্রমাণ না থাকলেও ট্রাম্পের সমর্থকেরা দাবি করতে থাকেন নির্বাচন চুরি হয়েছে। কংগ্রেস যখন জো বাইডেনের বিজয় নিশ্চিত করছিল, তখন ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি জনতা ক্যাপিটল ভবনে হামলা চালায়। কিউঅ্যাননের প্রতীক ও স্লোগান বহনকারী সেই জনতা প্রমাণ করে যে, মিথ্যা শুধু বিশ্বাস বদলায়নি, তা মানুষকে সহিংসতায় প্ররোচিত করেছে। দ্রোশোঁর মতে, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন তা ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমর্থন পায়।




























