হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা ও ইরানের অর্থনীতিতে চরম সংকট

- আপডেট সময় : ১২:৩০:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতার মাধ্যমে পুনরায় আলোচনা শুরু করলেও, সামরিক তৎপরতা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বাজারে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কৌশলগত এই জলপথের প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া, লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের প্রতিবন্ধকতা এবং কাস্পিয়ান সাগরে ইরানি জাহাজে ইউক্রেনের হামলার ঘটনায় উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্বিতীয়বারের মতো ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ কার্যকর করেছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় ইরান ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে, যার মধ্যে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় আরও ৬৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রির চুক্তি ছিল, যা বর্তমানে স্থগিত। গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয় এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। এতে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসে এবং ইরানের আঞ্চলিক জলসীমায় অপেক্ষমাণ সুপারট্যাঙ্কারগুলো থেকে তেল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়। জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বছরের প্রথমার্ধে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয় হয়েছে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে। তবে বর্তমান অবরোধের কারণে খার্গ দ্বীপসহ অন্যান্য রপ্তানি কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা ১২টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশ অমান্য করায় দুটি জাহাজ বিকল করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে দড়ি বেয়ে 'চারমিনার' নামক একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অভিযানের ভিডিও প্রকাশ করেছে, যা গত বছর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরানি তেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হোসেইন শামখানি ইরান ও রাশিয়ার গোপন নৌবহর পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন।
অন্যদিকে, ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে প্রণালিটি বন্ধ রাখতে প্রতিদিন একাধিক জাহাজ ঘুরিয়ে দিচ্ছে এবং কোনো চাপের কাছে মাথা নত না করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার জন্য সময় দিচ্ছেন এবং ইরানও অঞ্চলজুড়ে পাল্টা হামলা বন্ধ রেখেছে। ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে বলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষে শুরু হওয়া সংঘাতের কারণে দেশটির দৈনিক প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ৬৫ কোটি ঘনমিটার থেকে কমে প্রায় ৪২ কোটি ঘনমিটারে নেমেছে। পার্স স্পেশাল ইকোনমিক এনার্জি জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াত আসাদি আগামী কয়েক মাসে ১০ কোটি ঘনমিটার উৎপাদন ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের আশা প্রকাশ করেছেন। জ্বালানি মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে যে, দৈনিক ২ কোটি লিটারের বেশি পেট্রোল ঘাটতি মেটাতে মাসিক জ্বালানি ব্যবহারের সীমা কমানো বা তৃতীয় স্তরের দাম দ্বিগুণ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এর আগে ডিসেম্বরে পেট্রোলের দাম এক দফা বাড়ানো হয়েছিল, যার কয়েক সপ্তাহ পরই জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। ২০১৯ সালের নভেম্বরেও রাতারাতি জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দেশব্যাপী মারাত্মক বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া চীনের সঙ্গে বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; চীনা কাস্টমসের তথ্যমতে, মার্চ ও জুনে চীনের সঙ্গে ইরানের তেল-বহির্ভূত বাণিজ্য আগের বছরের তুলনায় ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সাবা পেনশন স্ট্র্যাটেজিস ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার এ বছর ৪৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় তারা ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলারের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে (তবে এর সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি)। এছাড়া গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় আরও ৬৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রি করা হয়েছে, যা বর্তমানে স্থ
গত ১৩ এপ্রিল আরোপিত আগের অবরোধটি দুই মাসের কিছু বেশি সময় ধরে চলেছিল। ওই সময়ে ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল বলে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে। দীর্ঘস্থায়ী দ্বিতীয় অবরোধের কারণে ইরানের রপ্তানি আয় আরও কমার এবং খার্গ দ্বীপের ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।




























