চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩৭১, ঢাকাকে ছাড়াল বাইরের সংক্রমণ ও প্রাণহানি
- আপডেট সময় : ০৪:৪৫:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

দেশে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও প্রাণহানি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন বছরজুড়েই আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত ৩৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর বাইরে প্রাণ হারিয়েছেন ২১৬ জন এবং ঢাকায় মারা গেছেন ১৫৫ জন। এ বছর মোট আক্রান্ত ১ লাখ ১৯ হাজার ৮০১ জনের মধ্যে ৯৩ হাজারের বেশি রোগীই ঢাকার বাইরের। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ১ হাজার ২৯৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ১ জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর আঞ্চলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরের বাইরে ঢাকা জেলায় মারা গেছেন ২৩ জন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ৬৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩০ জন, বরিশাল বিভাগে ২৮ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৩ জন, রংপুরে ৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ৩ জন মারা গেছেন। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নেওয়া মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ৮০১ জন রোগীর মধ্যে ঢাকার বাইরে ৯৩ হাজার ৬১৬ জন এবং ঢাকা মহানগরে ২৬ হাজার ১৮৫ জন রয়েছেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাসের বিশেষ অভিযান চালু করে সরকার। জনসচেতনতা সৃষ্টি, প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা জোরদার এবং সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ সমন্বিত করতে এই কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, যা গত ১২ই সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে মাঠে এই কর্মসূচির আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ জানান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আশাব্যাঞ্জক কিছু দেখা যাচ্ছে না, বরং চিত্রটি হতাশার। তিনি বলেন, রোগটি এখন ঢাকার বাইরে গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটিই জানা সম্ভব হচ্ছে না। ২০০০ সাল থেকে সিটি করপোরেশনগুলো কেবল ফগিং ও লার্ভিসাইডের ওপর নির্ভরশীল থেকে যে ভুল পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তা কার্যকর নয়। তিনি সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা 'ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট' (আইভিএম) প্রয়োগের ওপর জোর দেন।
অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ আরও উল্লেখ করেন যে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের মতো কীটতত্ত্ববিদ, টেকনিশিয়ান ও ল্যাবরেটরি সুবিধার তীব্র সংকট রয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনে মাত্র দুইজন কীটতত্ত্ববিদ থাকলেও তারা পুরোপুরি ফোকাসড হয়ে কাজ করার সুযোগ পান না। প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক জনবল ও সরঞ্জাম ছাড়া এসব প্রযুক্তি কার্যকর হচ্ছে কি না তা জানা সম্ভব নয়, ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানান, তাদের তৈরি পূর্বাভাস মডেল আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে, তবে নভেম্বরে তা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তিনি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলেন, এডিস মশা কেবল দিনে নয়, রাতেও মানুষকে কামড়ায়। সরকারি পদক্ষেপগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি এলাকাভিত্তিক টার্গেটেড মশা নিধনের অভাব এবং মশা নিয়ন্ত্রণে জনগণের কার্যকর সম্পৃক্ততা না থাকাকে চিহ্নিত করেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু দমনে কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবেই প্রতি বছর বিপুল মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। অতীতে গাপ্পি মাছ দিয়ে লার্ভা নিধন, বন্ধ্যা পুরুষ মশা অবমুক্তকরণ কিংবা ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত মশা ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দেশে ২০২৩ সালে রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩২৩ জন। চলতি বছরের বর্তমান মৃত্যুর সংখ্যা (৩৭ি) ইতিমধ্যেই গত বছরের মোট মৃত্যুকে ছাড়িয়ে গেছে।




























