ঢাকা ০৮:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ক্রিকেটার রবিন দাসের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, আদালতে হাজিরা ৯ অক্টোবর বিকাশ, রবিসহ ৪ ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক শাহ আলীতে পলিথিন ব্যাগ থেকে নবজাতক উদ্ধার, ৯৯৯-এ ফোন সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা রাজশাহীতে মাদকাসক্ত ছেলের হাসুয়ার কোপে মা নিহত, বাবা আহত সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত গোবিপ্রবির ৫ শিক্ষার্থী মক্কা-জেদ্দাসহ সৌদির বিভিন্ন এলাকায় সিভিল ডিফেন্সের সতর্কতা জারি আ.লীগ ফিরলে জামায়াত নেতাদের আবারও ফাঁসি দেবে: রাশেদ খাঁন মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতা ইসলামের চিরন্তন শিক্ষা এমপি গাজী নজরুল আবারও রিমান্ডে, এবার ৪ দিনের

আখাউড়ার ১২০ একরের পদ্ম বিলে দর্শনার্থীদের ভিড়, বাড়ছে পর্যটন সম্ভাবনা

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৪:৪৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



বর্ষার পানিতে টইটম্বুর চারপাশ। তার বুকজুড়ে ফুটে রয়েছে অজস্র পদ্মফুল। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজের বিশাল ক্যানভাসে কেউ যেন বিছিয়ে দিয়েছে গোলাপি আর সাদা ফুলের নরম চাদর। মৃদু বাতাসে ভেসে আসছে পদ্মের মিষ্টি সুবাস। প্রকৃতির এমন অপরূপ রূপ উপভোগ করতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী ও প্রকৃতিপ্রেমী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্ম বিল এখন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। বর্ষা এলেই গ্রামীণ এই প্রত্যন্ত অঞ্চল পদ্মের সৌন্দর্যে মুখর হয়ে ওঠে। দর্শনার্থীরা সকাল-বিকেলে ছোট ছোট নৌকায় চড়ে বিলের বুক ঘুরে বেড়ান এবং এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি জেলার অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে বর্তমানে এখানে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার বেশ অভাব রয়েছে। বিশেষ করে শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের নির্দিষ্ট স্থানসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা না থাকায় দর্শনার্থীদের প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাই বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে একটি পর্যটকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা ও আগত দর্শনার্থীরা।

সীমান্তঘেঁষা ১২০ একরের এই পদ্ম বিলটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে যেতে হলে আখাউড়া-কসবা আঞ্চলিক সড়ক ধরে মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দিয়ে টনকি কর্মমঠ এলাকায় পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে স্থানীয়দের সহায়তায় সহজেই ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্ম বিলে যাওয়া যায়। আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ হওয়ায় সিএনজি অটোরিকশার মতো ছোট যানবাহনে যাতায়াত করা তুলনামূলক সুবিধাজনক। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা এই বিলটি আখাউড়া ও কসবা উপজেলার মধ্যবর্তী এলাকায় বিস্তৃত। কসবা অংশে অনেকে এটিকে ‘গোসাইস্থল পদ্ম বিল’ নামেও ডেকে থাকেন। বিলটির পশ্চিম পাশে বাংলাদেশের আখাউড়া-কসবা এবং পূর্ব পাশে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মাধবপুর থানা অবস্থিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিলটির মোট আয়তন প্রায় ১২০ একর।

প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এই বিলে পদ্ম ফুটতে শুরু করে। সাধারণত আষাঢ় মাস থেকে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং শ্রাবণ মাসে বিলের সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়। টানা কার্তিক মাস পর্যন্ত বিলের বিভিন্ন স্থানে পদ্মের দেখা মেলে। পদ্মের এই মৌসুমে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। কেউ আসেন সপরিবারে, কেউবা বন্ধুদের দল নিয়ে। অনেকেই স্থানীয় মাঝিদের কাছ থেকে ছোট ডিঙি নৌকা ভাড়া করে বিলের গভীরে গিয়ে পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। নৌকায় বসে চারপাশের ফুলের রাজ্য দেখার এই মুহূর্তগুলো দর্শনার্থীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকে।

ঢাকা থেকে আখাউড়ায় স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে এসে এই বিলে ঘুরতে যাওয়া পর্যটক জোনায়েদ হোসেন বলেন, স্বজনদের কাছ থেকে শুনে তিনি বিলটি দেখতে এসেছেন। বিলের পাড়ে পৌঁছে পদ্মের সৌন্দর্য ও সুবাসে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি বলেন, এখানে না এলে প্রকৃতি যে নিজস্ব রূপে কতটা সুন্দরভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারে, তা হয়তো জানাই হতো না। দেশের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া উচিত নয় এবং এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে।

স্থানীয় পর্যটক কবীর আহম্মেদ জানান, প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে পদ্মপ্রেমীরা এখানে ছুটে আসেন। নৌকায় চড়ে বিলের মাঝখানে গেলে অন্য এক জগতে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়। তবে সুযোগ-সুবিধার অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক দর্শনার্থী বিল ঘুরে আসার পর পোশাক পরিবর্তন বা শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু সেখানে কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের সমস্যায় পড়তে হয়। দ্রুত এই সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পদ্ম বিলের সৌন্দর্য রক্ষায় স্থানীয়ভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম দীপক। তিনি বলেন, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে শত শত দর্শনার্থী এখানে আসেন। তাঁদের নিরাপত্তা এবং বিলের পরিবেশ রক্ষায় একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার পাশাপাশি একজন গ্রাম পুলিশকেও সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা পদ্মফুল না ছেঁড়েন। তিনি বলেন, দর্শনার্থীরা সচেতন হয়ে ফুল না ছিঁড়লে বিলের সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী হবে। পর্যটকদের জন্য শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করে তিনি জানান, গত বছরও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে একটি সরকারি শৌচাগার নির্মাণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া জানান, বর্তমানে বিলে প্রচুর পদ্ম ফুটেছে। দর্শনার্থীরা যাতে ফুল না ছেঁড়েন, সে জন্য আগে সাইনবোর্ড ও ব্যানার লাগানো হয়েছিল। কিন্তু অসচেতনতার কারণে অনেকে সেগুলো সরিয়ে ফেলেছেন এবং ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছেন। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন যদি হাজারো মানুষ এসে প্রত্যেকে একটি করেও ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যান, তবে কয়েক দিন পর আর কোনো ফুলই থাকবে না। সৌন্দর্য রক্ষায় গ্রাম পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের সচেতন করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি পরিবেশবাদীদের সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে। পর্যটকদের সুবিধা বাড়াতে ওয়াশ ব্লক ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে এর টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। শিগগিরই এই নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পদ্মের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর পরিবেশগত গুরুত্বও অপরিসীম বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনির হোসেন। তিনি বলেন, পদ্ম বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপায়ে বংশবিস্তার করে থাকে। পদ্মের বীজ পাখিদের অন্যতম প্রিয় খাবার এবং পাখির মাধ্যমেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে এই বীজ ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া জলাশয়ের পানির মাধ্যমেও এর বিস্তার ঘটে। তিনি আরও জানান, পদ্মের ভূগর্ভস্থ কন্দ বা রাইজম দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে গেলেও মাটির গভীরে থাকা কন্দ টিকে থাকে এবং পরবর্তীতে পানি এলে সেখান থেকে আবার নতুন গাছ জন্মায় ও ফুল ফোটে।

মনির হোসেনের মতে, পদ্ম জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করে। পদ্ম ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদের ঝোপ মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। এই উদ্ভিদগুলো না থাকলে অনেক মাছ আশ্রয় হারাবে। একই সঙ্গে পদ্মের বীজ পাখির খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে পদ্ম বিলুপ্ত হলে এর ওপর নির্ভরশীল পাখি ও জলজ প্রাণীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এই প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণ করা শুধু সৌন্দর্য রক্ষার বিষয় নয়, এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষার সঙ্গেও জড়িত।

বৈজ্ঞানিক ও জীবাশ্ম রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন ক্রিটেসিয়াস যুগেও পদ্মজাতীয় উদ্ভিদের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। দীর্ঘকাল ধরে জলাভূমি ও মিঠাপানির পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত এই উদ্ভিদ দক্ষিণ এশিয়ার প্রকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এছাড়া ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবেও পদ্মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে পদ্ম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। ফলে দুর্গাপূজার আগে এই বিলে পদ্ম দেখতে অনেক দর্শনার্থীর আগ্রহ থাকে। প্রকৃতির আপন নিয়মে প্রতিবছর বর্ষায় পদ্মে ভরে ওঠা আখাউড়ার এই ১২০ একরের জলাভূমি এখন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। পরিকল্পিত সংরক্ষণ, দর্শনার্থীদের সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই পদ্ম বিল হয়ে উঠতে পারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

নিউজটি শেয়ার করুন

আখাউড়ার ১২০ একরের পদ্ম বিলে দর্শনার্থীদের ভিড়, বাড়ছে পর্যটন সম্ভাবনা

আপডেট সময় : ০৪:৪৮:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বর্ষার পানিতে টইটম্বুর চারপাশ। তার বুকজুড়ে ফুটে রয়েছে অজস্র পদ্মফুল। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজের বিশাল ক্যানভাসে কেউ যেন বিছিয়ে দিয়েছে গোলাপি আর সাদা ফুলের নরম চাদর। মৃদু বাতাসে ভেসে আসছে পদ্মের মিষ্টি সুবাস। প্রকৃতির এমন অপরূপ রূপ উপভোগ করতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী ও প্রকৃতিপ্রেমী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্ম বিল এখন ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। বর্ষা এলেই গ্রামীণ এই প্রত্যন্ত অঞ্চল পদ্মের সৌন্দর্যে মুখর হয়ে ওঠে। দর্শনার্থীরা সকাল-বিকেলে ছোট ছোট নৌকায় চড়ে বিলের বুক ঘুরে বেড়ান এবং এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি জেলার অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে বর্তমানে এখানে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার বেশ অভাব রয়েছে। বিশেষ করে শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের নির্দিষ্ট স্থানসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা না থাকায় দর্শনার্থীদের প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাই বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে একটি পর্যটকবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা ও আগত দর্শনার্থীরা।

সীমান্তঘেঁষা ১২০ একরের এই পদ্ম বিলটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেখানে যেতে হলে আখাউড়া-কসবা আঞ্চলিক সড়ক ধরে মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দিয়ে টনকি কর্মমঠ এলাকায় পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে স্থানীয়দের সহায়তায় সহজেই ধর্মনগর কালীবাড়ি পদ্ম বিলে যাওয়া যায়। আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ হওয়ায় সিএনজি অটোরিকশার মতো ছোট যানবাহনে যাতায়াত করা তুলনামূলক সুবিধাজনক। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা এই বিলটি আখাউড়া ও কসবা উপজেলার মধ্যবর্তী এলাকায় বিস্তৃত। কসবা অংশে অনেকে এটিকে ‘গোসাইস্থল পদ্ম বিল’ নামেও ডেকে থাকেন। বিলটির পশ্চিম পাশে বাংলাদেশের আখাউড়া-কসবা এবং পূর্ব পাশে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মাধবপুর থানা অবস্থিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিলটির মোট আয়তন প্রায় ১২০ একর।

প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এই বিলে পদ্ম ফুটতে শুরু করে। সাধারণত আষাঢ় মাস থেকে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং শ্রাবণ মাসে বিলের সৌন্দর্য পূর্ণতা পায়। টানা কার্তিক মাস পর্যন্ত বিলের বিভিন্ন স্থানে পদ্মের দেখা মেলে। পদ্মের এই মৌসুমে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসেন। কেউ আসেন সপরিবারে, কেউবা বন্ধুদের দল নিয়ে। অনেকেই স্থানীয় মাঝিদের কাছ থেকে ছোট ডিঙি নৌকা ভাড়া করে বিলের গভীরে গিয়ে পদ্মের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। নৌকায় বসে চারপাশের ফুলের রাজ্য দেখার এই মুহূর্তগুলো দর্শনার্থীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকে।

ঢাকা থেকে আখাউড়ায় স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে এসে এই বিলে ঘুরতে যাওয়া পর্যটক জোনায়েদ হোসেন বলেন, স্বজনদের কাছ থেকে শুনে তিনি বিলটি দেখতে এসেছেন। বিলের পাড়ে পৌঁছে পদ্মের সৌন্দর্য ও সুবাসে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি বলেন, এখানে না এলে প্রকৃতি যে নিজস্ব রূপে কতটা সুন্দরভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারে, তা হয়তো জানাই হতো না। দেশের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া উচিত নয় এবং এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে।

স্থানীয় পর্যটক কবীর আহম্মেদ জানান, প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে পদ্মপ্রেমীরা এখানে ছুটে আসেন। নৌকায় চড়ে বিলের মাঝখানে গেলে অন্য এক জগতে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয়। তবে সুযোগ-সুবিধার অভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক দর্শনার্থী বিল ঘুরে আসার পর পোশাক পরিবর্তন বা শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু সেখানে কোনো সুব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের সমস্যায় পড়তে হয়। দ্রুত এই সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পদ্ম বিলের সৌন্দর্য রক্ষায় স্থানীয়ভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মনিয়ন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম দীপক। তিনি বলেন, প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে শত শত দর্শনার্থী এখানে আসেন। তাঁদের নিরাপত্তা এবং বিলের পরিবেশ রক্ষায় একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার পাশাপাশি একজন গ্রাম পুলিশকেও সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা পদ্মফুল না ছেঁড়েন। তিনি বলেন, দর্শনার্থীরা সচেতন হয়ে ফুল না ছিঁড়লে বিলের সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী হবে। পর্যটকদের জন্য শৌচাগারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করে তিনি জানান, গত বছরও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে একটি সরকারি শৌচাগার নির্মাণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া জানান, বর্তমানে বিলে প্রচুর পদ্ম ফুটেছে। দর্শনার্থীরা যাতে ফুল না ছেঁড়েন, সে জন্য আগে সাইনবোর্ড ও ব্যানার লাগানো হয়েছিল। কিন্তু অসচেতনতার কারণে অনেকে সেগুলো সরিয়ে ফেলেছেন এবং ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছেন। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন যদি হাজারো মানুষ এসে প্রত্যেকে একটি করেও ফুল ছিঁড়ে নিয়ে যান, তবে কয়েক দিন পর আর কোনো ফুলই থাকবে না। সৌন্দর্য রক্ষায় গ্রাম পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের সচেতন করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি পরিবেশবাদীদের সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে। পর্যটকদের সুবিধা বাড়াতে ওয়াশ ব্লক ও পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে এর টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। শিগগিরই এই নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পদ্মের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর পরিবেশগত গুরুত্বও অপরিসীম বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মনির হোসেন। তিনি বলেন, পদ্ম বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপায়ে বংশবিস্তার করে থাকে। পদ্মের বীজ পাখিদের অন্যতম প্রিয় খাবার এবং পাখির মাধ্যমেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে এই বীজ ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া জলাশয়ের পানির মাধ্যমেও এর বিস্তার ঘটে। তিনি আরও জানান, পদ্মের ভূগর্ভস্থ কন্দ বা রাইজম দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে গেলেও মাটির গভীরে থাকা কন্দ টিকে থাকে এবং পরবর্তীতে পানি এলে সেখান থেকে আবার নতুন গাছ জন্মায় ও ফুল ফোটে।

মনির হোসেনের মতে, পদ্ম জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করে। পদ্ম ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদের ঝোপ মাছের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। এই উদ্ভিদগুলো না থাকলে অনেক মাছ আশ্রয় হারাবে। একই সঙ্গে পদ্মের বীজ পাখির খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে পদ্ম বিলুপ্ত হলে এর ওপর নির্ভরশীল পাখি ও জলজ প্রাণীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই এই প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণ করা শুধু সৌন্দর্য রক্ষার বিষয় নয়, এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষার সঙ্গেও জড়িত।

বৈজ্ঞানিক ও জীবাশ্ম রেকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন ক্রিটেসিয়াস যুগেও পদ্মজাতীয় উদ্ভিদের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। দীর্ঘকাল ধরে জলাভূমি ও মিঠাপানির পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত এই উদ্ভিদ দক্ষিণ এশিয়ার প্রকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এছাড়া ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবেও পদ্মের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে পদ্ম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। ফলে দুর্গাপূজার আগে এই বিলে পদ্ম দেখতে অনেক দর্শনার্থীর আগ্রহ থাকে। প্রকৃতির আপন নিয়মে প্রতিবছর বর্ষায় পদ্মে ভরে ওঠা আখাউড়ার এই ১২০ একরের জলাভূমি এখন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। পরিকল্পিত সংরক্ষণ, দর্শনার্থীদের সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই পদ্ম বিল হয়ে উঠতে পারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh